রাষ্ট্র পরিচালনা করিবার জন্য শক্তি, বুদ্ধি, কৌশল ও দক্ষতার প্রয়োজন-এই কথা সকলেই জানে; কিন্তু একটি রাষ্ট্রকে রক্ষা ও উন্নতির পথে চালাইবার জন্য যে মানসিক প্রজ্ঞা, নৈতিক বল এবং ভবিষ্যৎ-দৃষ্টিসম্পন্ন প্রজ্ঞা চাই, তাহা বিরল গুণ। একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে কেবল তাহার প্রশাসনিক কাঠামোর উপর নহে, বরং যাহারা সেই কাঠামো পরিচালনা করেন, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপর। রাজনীতি মানবসভ্যতার সবচাইতে জটিল ও দায়িত্বপূর্ণ কর্মযজ্ঞ। কারণ রাজনীতিকের হাতে গড়িয়া উঠে একটি রাষ্ট্রের চরিত্র, একটি জাতির নীতি ও মানবতার পথনির্দেশ: কিন্তু সেই রাজনীতির মধ্য হইতে যিনি বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেশ ও কালের চাইতে মানবতার কল্যাণ ভাবিতে পারেন, তিনিই প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক বা স্টেটসম্যান।
প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক হওয়া সহজ নহে। ইহা কেবল বক্তৃতার শিল্প নহে, কিংবা ক্ষমতার সিংহাসনে পৌঁছাইবারও বিষয় নহে। রাষ্ট্রনায়কত্ব এক মানসিক পরিপক্কতা, যেইখানে রাজনীতিকের সকল অভিজ্ঞতা ও সহিষ্ণুতা রূপান্তরিত হয় প্রজ্ঞায়। তাহারা জানেন-ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী: কিন্তু দায়িত্ব চিরস্থায়ী। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-শাসক অনেকেই ছিলেন; কিন্তু সকল শাসক রাজনীতিবিদ নহেন; আবার সকল রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রনায়কও নহেন। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যই এক দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে। একজন আমলা কেবল কথিত শৃঙ্খলা রক্ষা করিতে পারেন; কিন্তু একজন রাজনীতিবিদ জনগণের আত্মার কথা অনুধাবন করিতে পারেন। কারণ তাহার কাজ প্রশাসন নহে, সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্তর্গত বোধকে একত্রিত করা।
যিনি সেই বোধকে হৃদয়ে ধারণ করেন এবং শত্রুকেও প্রতিপক্ষ বলিয়া সম্মান দিতে জানেন-তিনিই রাষ্ট্রনায়ক। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন তাহারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি প্রথমে রাজনীতিক, পরবর্তীকালে রাষ্ট্রনায়ক। তিনি জানিতেন, প্রতিশোধের রাজনীতি কেবল রাষ্ট্র ভাঙে: কিন্তু ক্ষমার রাজনীতি রাষ্ট্র গড়ায়। দীর্ঘ কারাবাসের পর যখন তাহার হাতে ক্ষমতা আসে, তিনি প্রতিহিংসার পরিবর্তে ঐক্যের পথে হাঁটিলেন। তাহার সেই দূরদৃষ্টি প্রমাণ করিল-একজন সত্যিকারের রাজনৈতিক নেতার মধ্যেই রাষ্ট্রনায়ক জন্ম নেয়।
রাজনীতিবিদদের প্রতি হীনদৃষ্টি রাখিবার প্রবণতা আজ তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে লক্ষ্য করা যায়। যেন রাজনীতি মানেই অসততা; যেন নেতা মানেই ক্ষমতালিন্স ব্যক্তি। অথচ এই দৃষ্টিভঙ্গিই সভ্যতাকে পিছাইয়া দেয়। কারণ রাষ্ট্রকে রক্ষা ও পরিচালনা করিবার মতো কঠিন কাজ আর কিছু নাই। রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিদিন সম্মুখীন হইতে হয় জনমতের চাপ, বিরোধের কণ্টক এবং নানান প্রলোভনের দ্বন্দ্বে। তাহাদের সহিষ্ণুতা, অভিজ্ঞতা ও মানসিক ভারসাম্যই রাষ্ট্রের স্থিতি রক্ষা করিতে পারে। রাষ্ট্রকে অগ্রগামী করিতে পারে। প্রকৃত রাজনৈতিক নেতাদের অনেক কিছু বিবেচনায় রাখিতে হয়, জনগণের পালস বুঝিতে হয়। অনেক কিছু সহ্য করিতে হয়। তিনি জানেন, অভাবিত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও গভীর প্রজ্ঞার সহিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে হয়। আজকের পৃথিবীতে যে নানাবিধ সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা দেখা যায়, তাহার মূলে নেতৃত্বের এই নৈতিক সংকটই সর্বাধিক প্রকট। রাষ্ট্র আছে, প্রশাসন আছে; কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক-মন নাই। রাষ্ট্রনায়কত্বের তিনটি মূল ভিত্তি-সহিষ্ণুতা, ন্যায়বোধ ও ত্যাগ। সহিষ্ণুতা তাহাকে শেখায় ভিন্নমতকে সম্মান দিতে, ন্যায়বোধ তাহাকে পথনির্দেশ করে সিদ্ধান্তে এবং ত্যাগ তাহাকে মানবতার স্তরে উন্নীত করে। এই তিন গুণ না থাকিলে রাষ্ট্রশাসক হওয়া যায়; কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হওয়া যায় না।
রাষ্ট্রনায়ক জানেন-সংঘাতের সমাধান অস্ত্রের দ্বারা নহে, বিবেকের দ্বারা হয়। তিনি জানেন, যে কোনো সিদ্ধান্তের মূলেই ন্যায়বোধ থাকিতে হয়, নতুবা সে সিদ্ধান্ত টিকিয়া থাকিতে পারে না। তাহার দৃষ্টি কেবল একটি দলের মঙ্গল বা একটি সময়ের স্বার্থে সীমাবদ্ধ নহে; তিনি ভাবেন রাষ্ট্রকে, ভাবেন মানুষকে, ভাবেন মানবসভ্যতার দিকনির্দেশকে। এই কারণেই রাষ্ট্রনায়কেরা কখনো জনপ্রিয়তার মোহে পতিত হন না, কারণ তিনি জানেন-অস্থায়ী হাততালির চাইতে ইতিহাসের শ্রদ্ধাপূর্ণ আসন অধিক স্থায়ী।
