বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক গড়ার জায়গা ‘ইয়াং সাউথ এশিয়ান লিডার্স ইনিশিয়েটিভ’

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৫, ২০:৫৩

কিছুদিন আগে যখন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ইয়াং সাউথ এশিয়ান লিডার্স ইনিশিয়েটিভ (ওয়াইএসএএলআই)–এ নির্বাচিত হওয়ার ইমেইল পেলাম, নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হিসেবে এমন একটি আন্তর্জাতিক সুযোগ পাওয়া আমার কাছে ছিল এক বিশাল অর্জন।

একদিকে শ্রীলঙ্কা সফরের সুযোগ, অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ নেতৃত্বদের সঙ্গে একত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা—আমার মতো একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটি ছিল জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা।

ওয়াইএসএএলআই প্রোগ্রামটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ নেতৃত্ব তৈরির একটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচি। এর লক্ষ্য—অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নাগরিক অংশগ্রহণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টেকসই সমাজ গঠন। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা—এই সাত দেশের আশিজনেরও বেশি তরুণ এতে অংশ নেন। বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছিল ১২ জন, আমি ছিলাম তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী।

প্রথম দিন আমরা ঘুরে দেখি কলম্বোর ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো। শ্রীলঙ্কার মানুষের অতিথিপরায়ণতা ও খাবারের বৈচিত্র্য সত্যিই মনে দাগ কেটেছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে রাস্তার বিখ্যাত খাবার ‘কোট্টু’ আর মিষ্টি নারিকেলের পানি।

দ্বিতীয় দিনের ওয়ার্কশপে আমাদের সঙ্গে ছিলেন শ্রীলঙ্কার ন্যাশনাল পিস কাউন্সিলের প্রধান ড. জেহান পেরেরা। তিনি বলেছিলেন, জনগণ সরকারের পতন ঘটাতে পারে, কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নাগরিকদের মধ্যে সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ। এই কথাগুলো আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এ শিক্ষা প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে।

সেদিন আরও কথা বলেছিলাম তাহিনা বুথ–এর সঙ্গে, যিনি গ্রাস স্কার্ট প্রজেক্ট–এর মাধ্যমে পাপুয়া নিউ গিনিতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করছেন। তার কথায় অনুপ্রাণিত হয়েছি—ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে।

প্রোগ্রামের সবচেয়ে চমৎকার অংশ ছিল ‘পিয়ার লিডারশিপ সার্কেল’। এখানে আমরা নিজ নিজ দেশের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি এবং সমাধানের পথ খুঁজেছি।

আমি ছিলাম আমাদের টেবিলের ফ্যাসিলিটেটর। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে নেতৃত্ব মানে শুধু নিজের মত প্রকাশ নয়, অন্যের মত শোনা ও মূল্যায়ন করাও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আমরা গিয়েছিলাম জায়াসেকারারামায়া মন্দিরে, যেখানে স্থানীয় ভিক্ষুরা স্কুল, ব্লাড ব্যাংকসহ কমিউনিটি প্রকল্প পরিচালনা করেন।
ওদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি—ছোট ছোট উদ্যোগ মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। মনে হয়েছে, এমন কিছু আমাদের দেশেও করা সম্ভব।

ওয়াইএসএএলআই শুধু শেখার সুযোগ নয়, এটি এক বিশাল বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক তৈরির জায়গা। দেশে ফিরে আমি ও আরও দুইজন অংশগ্রহণকারী মিলে শুরু করেছি ‘কিডস ফর নেচার’ নামের একটি প্রকল্প। এর উদ্দেশ্য—প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে সচেতন করা।

ওয়াইএসএএলআই আমাকে শিখিয়েছে—নেতৃত্বের জন্য বয়স নয়, দরকার কৌতূহল, সহানুভূতি ও নতুন কিছু করার মানসিকতা।
নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা ভেঙে বাইরে পা বাড়ানো, প্রশ্ন করা, মনোযোগ দিয়ে শোনা—এই তিনটি কাজই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

ইত্তেফাক/এএইচপি