চা-বাগানে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা 

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ১৫:৩৪

দেশের চা বাগানসমূহে সামগ্রিকভাবে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন যে প্রবণতা তা হলো—বেকারদের মধ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা অনেক। মা-বাবার স্বপ্নকে পূরণে বিএ, এমএ পাশ করে অনেকেই এখন হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছেন। যথারীতি চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন।

চা শ্রমিকরা জানান, পরিবারের সাত-আট সদস্যের মধ্যে এক জনের দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরিতে কোনোমতেই সংসার চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে চিকিৎসা, বাসস্থান, লেখাপড়া করানো ও পুষ্টিকর খাবার সাধ্যের বাইরে রয়েছে। সারা দেশে ১৬৭টি চা বাগানের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশু মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী রয়েছে। এদের মধ্যে চা বাগানে স্থায়ী এবং অস্থায়ী মিলিয়ে কর্মরত আছেন প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার জনগোষ্ঠী। এছাড়া, প্রায় অর্ধলক্ষাধিক শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী এবং প্রায় আড়াই লাখ বেকার নারী-পুরুষ রয়েছে। শিক্ষিতদের যুবক-যুবতীদের মধ্যে এসএসসি, এইচএসসি, গ্রাজুয়েশন ও মাস্টার্স সম্পন্নকারীরাও রয়েছেন। শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। তারপরও চাকরি না পেয়ে হতাশ জীবন ধারণ করছেন। যুবসমাজের মধ্যে কেউ কেউ নেশাগ্রস্তও হয়ে পড়ছেন। চা বাগানের মধ্যবয়সি বেকার নারী-পুরুষ এবং কিছু যুবক-যুবতী বাগানে কাজ না পেয়ে বস্তি এলাকা, বিন্ডিং কন্ট্রাকশন, মাটিকাটা, লাকড়ি করা, কৃষি কাজ ও নার্সারিসমূহে কাজ করে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্সসম্পন্ন করা শমশেরনগর চা বাগানের এক যুবক বলেন, ‘চাকরির জন্য আবেদনের সঙ্গে কাগজপত্র জমা দিতে দিতে অনেক টাকা খরচ করে ফেলছি। চাকরি পাওয়া এত কঠিন জানলে লেখাপড়াই করতাম না।’ একইভাবে দেওছড়া চা বাগানের বিএ পাশ অমৃত রবিদাস, রঞ্জিত রবিদাস, কানিহাটি চা বাগানের বিএ-অনার্স সন্ধিপ বীন, মাস্টার্স উত্তীর্ণ সঙ্গীতা বীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়েছি, চাকরি হয়নি। লেখাপড়া শেষ করে যদি চাকরিই না পাওয়া যায়, তাহলে লেখাপড়া করে কি লাভ? তারা আরও বলেন, ‘বিভিন্ন চা বাগানে অসংখ্য ছেলেমেয়ে শিক্ষিত হয়ে শুধু বেকার জীবনযাপনই করছেন না, হতাশাগ্রস্ত হয়েও পড়ছেন।’

শমশেরনগর কানিহাটি চা বাগানের প্রাক্তন ইউপি সদস্য ও চা শ্রমিক নেতা সীতারাম বীন বলেন, ‘চা বাগানে বেকারত্বের বোঝা ভয়াবহ। কাজকর্ম না পেয়ে অনেকেই চরম অভাব অনটনে দিনযাপন করছেন। শিক্ষিত বেকাররাও হতাশ হয়ে পড়ছে।’

শমশেরনগর চা বাগানের যুবনেতা মোহন রবিদাস বলেন, ‘আমাদের চা বাগানে বেকারত্বের বোঝা ভারী হচ্ছে। যুবকদের অনেকেই বিপথগামী হচ্ছে। কাজকর্ম না থাকায় বেকার মধ্যবয়সিরা নানা অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়ে দুঃখ-কষ্টে জীবনযাপন করছেন। অভাবী সংসারের লাগাম টানতে কেউ কেউ বস্তি এলাকায় গিয়ে মাটিকাটা, লাকড়ি কাটাসহ কঠিন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।’

চা শ্রমিক ইউনিয়নের প্রাক্তন উপদেষ্টা রাজভজন কৈরী জানান, চা বাগানে শ্রমিকদের ব্যাপক একটি অংশ বেকার রয়েছে। সারা দেশে চা বাগানের শিক্ষিত চা জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট জরিপ সম্পন্ন করা না হলেও প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এদের কর্মসংস্থানের জন্য মালিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। শ্রমিকের ক্ষেত্রে শ্রমিক নিয়োগ, সাতটি ভ্যালিতে কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন ও সরকারি চাকরিতে উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে কৌটা সুবিধার দাবি জানানো হয়েছে।

ইত্তেফাক/এসএএস