ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়েও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের মতো নানা মত, অভিমত, অভিযোগ দাঁড় করানোর চর্চা যেন বন্ধই হচ্ছে না। কাউকে হেয় করে, দায়ী করে ঘটনা শেষ করে ফেলা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আগুনে ক্ষতির নানা অঙ্ক দাঁড় করানো হয়েছে। আরো হবে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি বলে অনুমান তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ নেতাদের। অন্যান্য খাত থেকেও কিছু হিসাব দেওয়া হয়েছে। কোনো হিসাবই এখনো চূড়ান্ত নয়। সম্পূর্ণ তদন্ত শেষে সামগ্রিক ক্ষতির চিত্র পাওয়া যাবে। এদিকে, ঘটনার দায়দায়িত্ব নিরূপণও চলছে। দেশি-বিদেশি তদন্ত তো আছেই। ঘটনায় লাভটা হলো কার? এখন পর্যন্ত আলোকপাত সেদিকে যায়নি। সোজা কথায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দেশের, যা অঙ্কে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যে কোনো ঘটনা দ্রুত আন্তর্জাতিক খবর হয়ে যায় স্বাভাবিকভাবেই। আন্তর্জাতিক সব মিডিয়াতেই এসেছে এ খবরটি। এর মধ্য দিয়ে বিদেশিদের কাছে একটা খারাপ বার্তাই গেল। এতে দেশের ইমেজের যে ক্ষতি হয়েছে, তা টাকার অঙ্কে নির্ধারণের মতো নয়। আর দেশের ক্ষতি হলে কার লাভ হয়, সেই বিশ্লেষণ নেই বললেই চলে।
অগ্নিকাণ্ডে বিপুল অঙ্কের পণ্য পুড়ে গেছে। ধ্বংস হয়েছে গার্মেন্টস রপ্তানির চালান, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের শত শত শিপমেন্ট। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দেশের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার ওপরও বড় আঘাত এসেছে। এখানে কর্তৃপক্ষীয় মোটা দাগে দুটি ভাগ আছে। একটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আরেকটি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, সংক্ষেপে বেবিচক। কার্গো নামানো থেকে শুরু করে আমদানিকারকের হাতে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার-বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আর বেবিচক বিমানবন্দরের মালিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও কার্গো টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা তদারকি করে। এজন্য বিমানবন্দর ব্যবহার, নিরাপত্তা যাচাই, স্ক্যানিং ও পার্কিং চার্জ নেয় বেবিচক। দায় ও দায়িত্ব উভয়েরই। রপ্তানিকারকেরা দীর্ঘদিন ধরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লজিস্টিক অদক্ষতা ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো নিয়ে অভিযোগ করে আসছেন। সীমিত স্থান ও অপর্যাপ্ত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার কারণে বৃহৎ মালবাহী বিমানের পরিচালনাও সীমিত। বছরে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টন পণ্য শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে পরিবহন করা হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব পালন করলেও নিজস্ব ফ্লাইটে পণ্য পরিবহন করে মাত্র প্রায় ১৭ শতাংশ। এছাড়া এমিরেটস এয়ারলাইনস, ক্যাথে প্যাসিফিক, কাতার এয়ারওয়েজ, টার্কিশ এয়ারলাইনস ও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস ঢাকা থেকে কার্গো পরিবহন পরিচালনা করে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ৪৫টি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অপারেশন চালায়। তাদের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার কোটি টাকার মালামাল আসে। কিছু গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনা ছিল বলেই একটা ছোট জায়গায় লাগা আগুন এত বড় হয়ে গেল। চট্টগ্রাম ইপিজেডে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর কার্গো ভিলেজে এ ধরনের ঘটনা আমাদের উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডটি দুর্ঘটনা, না ষড়যন্ত্র, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় কোনো অব্যবস্থাপনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও তুরস্ক থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এ বিষয়ে বিস্তারিত বলেছেন। একটু অপেক্ষা করতেও বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে মিডিয়া ট্রায়ালে দোষী শনাক্ত করে ফেলা হয়, যা বিবেকবান কারোই কাম্য নয়।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মূল মন্ত্রই ছিল একতা ও সংহতি। তা ভুলে কোনো ঘটনায় বিচারের আগেই বিচার সেরে ফেলার ফ্যাসিজম। ঘটনা-দুর্ঘটনা নিয়েও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের মতো নানা মত, অভিমত, অভিযোগ দাঁড় করানোর চর্চা যেন বন্ধই হচ্ছে না। কাউকে হেয় করে, দায়ী করে ঘটনা শেষ করে ফেলা। সেখান থেকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না জাতির আশা-ভরসার প্রতীক সেনাবাহিনীকেও। বরং একটু বেশিই হচ্ছে বাহিনীটি নিয়ে। যে কারণে বিমানবন্দরের ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনাকে যেন কেউ পুঁজি করতে না পারে, দেশি-বিদেশি কোনো চক্র যেন এ থেকে ফায়দা নিতে না পারে, সেই সতর্কতার রয়েছে ব্যাপক ঘাটতি। উপরন্তু আরো উসকানি-বিভ্রান্তির বেড়াজাল ছেটানো হচ্ছে। কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার কিছুক্ষণের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ভাইরাল হয়। তারা নিজের জীবন বাজি রেখে আগুনের ভয়াল থাবা থেকে কেউ ফর্ক লিফটার, কেউ খালি হাতে কিছু মাল নিরাপদে রক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। দুঃখজনকভাবে এ মানুষগুলোকেও দিন শেষে ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে পার্শ্ববর্তী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার লোক বলে প্রচার করতেও বিবেকে বাধেনি।
বেবিচককে দোষীসাব্যস্ত করতে পারলে শাস্তিও দিয়ে ফেলার এক ছেলে মানুষি ছিল লক্ষণীয়। আগুন লাগার পর নিরাপত্তার অজুহাতে দেড় ঘণ্টা কোনো ফায়ার ভেহিকল ঢুকতে দেওয়া হয়নি, এমন মনগড়া তথ্য ছড়ানো হয় দ্রুত। ঘটনার আকস্মিক ভয়াবহতায় যখন সব এজেন্সি হতবিহ্বল, এক প্রবাসী সাংবাদিকের ফেসবুক থেকে পর পর দুদিন দু পর্বের স্ট্যাটাস পোস্ট করা হয়। মুখোমুখি করা হয় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকেও; সঙ্গে এপিবিএনকেও।
এপিবিএন ২০১০ সাল থেকেই বিমানবন্দরে বহিরাঙ্গনের ল্যান্ড সাইডের নিরাপত্তায় নিয়োজিত। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বেবিচক চেয়ারম্যান সব বাহিনীকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও দিয়ে রেখেছেন। পরে লোকবল অভাবের কারণে একপর্যায়ে এপিবিএনকে বহিরাঙ্গনের পাশাপাশি এয়ার সাইডে নিরাপত্তার দায়িত্বও দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, জুলাই আন্দোলনে এপিবিএনের পোস্ট দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বিমানবাহিনী থেকে ৮৫০ জন জনবল নিয়ে এসে বিমানবন্দরের কার্যক্রম ছয় দিনের মধ্যে স্বাভাবিক করা হয়। পরবর্তীকালে এপিবিএন সদস্যরা কাজে ফিরলে তাদেরকে আগের মতো র্যান্ড সাইডের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া হয়।
কয়দিন আগে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহযোগী লুৎফে সিদ্দিকের সভাপতিত্বে এক সভায়ও বিষয়টি আসে। সেখানে বিমানবাহিনীকে নিজ দায়িত্বে ফিরতে এবং এপিবিএনকে এয়ার সাইডের দায়িত্ব বুঝে নিতে বলা হলেও গত ৬ অক্টোবর নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা বিমানবাহিনীকে সাধারণ কার্যক্রম চলমান রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। যথারীতি বর্তমানে সব বাহিনী বেবিচকের নির্দেশনামতো বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কাজ করছে। দেখছে যাত্রীসেবার মান। এরকম একটি অবস্থায়ও দেশের এ দুটি বাহিনীকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার ভিন্ন একটা আবহ ও নেরেটিভ দাঁড় করানো হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার। এখানে প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে ২০০৯ সালের সেই রক্তাক্ত বিডিআর হত্যাযজ্ঞের স্লট তৈরির কথা। বিডিআর ভার্সেস সেনাবাহিনী বিরোধ রচনা ও বিডিআর থেকে সেনাবাহিনীকে সরানো ছিল কুচক্রীদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এখন সেটার ভার্শন এসেছে বিমানবন্দর থেকে বিমানবাহিনীকে সরানোর এজেন্ডায়। এ লক্ষ্য পূরণে একটি নিপুণ কারসাজির আলামতও দৃশ্যমান। তা বোঝা দুর্বোধ্য নয়। স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞানেও তা বোধগম্য।
মতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর জায়গায় নিরাপত্তাঝুঁকি উসকে দেওয়ার মতলব ও উদ্দেশ্য কে না বোঝে? মহল বিশেষ সুপরিকল্পিতভাবে এর কলকাঠি নাড়ছে। সেনা, বিমানসহ আমাদের বাহিনীগুলোকে বিব্রত করা, ছোট করা এবং তাদের নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারলেই তারা লাভবান। বাহিনীগুলোর সুরক্ষায় এই চক্রকে কেবল মোকাবিলা নয়, দৃষ্টান্তমূলক বিহিতও দরকার। খুব খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে এ চক্রের উৎপাত ভয়ানক পর্যায়ে। কোথাও কোনো ঘটনা দেরি, ঘটনাকে পুঁজি করে বিভ্রান্তি ছড়াতে এবং নানা অপতথ্য রটিয়ে আমাদের বাহিনীগুলোকে অস্বস্তিতে ফেলার অপচেষ্টায় একটুও দেরি করছে না চক্রটি। এরা থাকছেই সুযোগের অপেক্ষায়।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
