সশস্ত্র বাহিনীর নির্বাচনি আবশ্যকতা

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০১:২৬

কেটেও কাটছিল না নির্বাচনি সংশয়। নানান যদি, তবে, কিন্তুর ফেরে পাকতে থাকে। এমন একটা অবস্থার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনী দিবসে সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে ১০ কথার এক কথা প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূসের। সুষ্ঠু নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিক সহায়তা চাইলেন তিনি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন, এ আশাবাদের কথাও জানান। কথা সোজাসিধা, বার্তা একদম পরিষ্কার। যার যা ইচ্ছা বা মনে করার অপশন আর নেই। তবে-যদি-কিন্তুরও সুযোগ নেই।

প্রধান উপদেষ্টার আমরা শিগগিরই একটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা নতুন বাংলাদেশের পথে যাত্রা করব। বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, চলমান দেশ পুনর্গঠন ও সংস্কার কার্যক্রমেও সশস্ত্র বাহিনী আগের মতোই মানুষের পাশে থেকে আস্থার প্রতিদান দিচ্ছে।

এর মধ্য দিয়ে বার্তা পরিষ্কার। শুধু নির্বাচন পর্যন্ত নয়, নির্বাচনের পরও সশস্ত্র বাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে থাকছে। তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে আরো আগেই। জন-আকাঙ্ক্ষার তাগিদ, বাস্তবতা ও সক্ষমতা বুঝেই সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও তদূর্ধ্ব সমপদমর্যাদার কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (কোস্ট গার্ড ও বিজিবিতে প্রেষণে নিয়োজিত সমপদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ) বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়িয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা বোধ করেই এমন সিদ্ধান্ত।

সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি জনমানুষের আস্থা-আকাঙ্ক্ষার ছাপই প্রতিফলিত হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার মধ্যে। সোয়া এক বছর আগে বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ফ্যাসিবাদী অপশাসনের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল সম্মিলিত প্রতিরোধ-ঐক্য। জনতার কাতারে এসে তারা ত্বরান্বিত করেছিল জনগণের চূড়ান্ত বিজয়কে। একটি ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক দেশ গড়তে কাঁধে কাঁধ বুকে বুক মিলিয়ে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়েছিল সশস্ত্র বাহিনী-ছাত্র-জনতার সুদৃঢ় ঐক্য। সশস্ত্র বাহিনী ও ছাত্র-জনতার মধ্যকার মৈত্রীর এই দৃঢ়বন্ধনই সার্থক উপসংহারে পৌঁছে দিয়েছিল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে। আন্দোলনকারীদের বুকে গুলি না চালানোর জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক সামরিক বাহিনীর ঐতিহাসিক এক সিদ্ধান্তই ঘুরিয়ে দিয়েছিল ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা আরো বেড়েছে। তা নির্বাচন প্রশ্নেও।

ভোটের রাজনীতির সব রকমের হিসাব-নিকাশও চলছে। ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, দেশের জনগণও ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে আছে। পুরোপুরি নির্বাচনি হাওয়া বইছে দেশে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে নির্বাচনি বিশাল ময়দান। এখনো পুলিশ পুরোদমে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক রাখতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দীর্ঘদিন আইনের প্যাঁচে সশস্ত্র বাহিনীকে ভোটের মাঠে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। এবার নির্বাচন কমিশন নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) 'আইন প্রয়োগকারী সংস্থা'র সংজ্ঞায় 'সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী'কে যুক্ত করেছে। এটি দেশের সাধারণ মানুষেরও চাওয়া। তাদের বিশ্বাস সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষেই একটি রক্তপাতমুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। প্রধান উপদেষ্টাও নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করে নির্বাচন সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর করতে সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষ ভূমিকা কামনা করেছেন।

বাংলাদেশে নির্বাচন তো একসময় সামাজিক উৎসবের মতোই ছিল। গ্রাম-গঞ্জে, হাট-বাজারে, রাজনৈতিক দলগুলো শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামত না, মানুষকে নিয়ে আনন্দমুখর পরিবেশও তৈরি করত। নির্বাচনি মিছিল মানেই ছিল উচ্ছ্বাস, গান, পোস্টার লাগানো, চায়ের দোকানে উত্তপ্ত আলোচনা, আর সন্ধ্যায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা রকম আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বলা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উৎসব-আনন্দ যেন ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়।

গত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই ভয়, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস এবং ব্যাপক অনিয়মের স্মৃতি। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচনি পরিবেশ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, মানুষ নির্বাচনকে আর উৎসব মনে করত না; বরং অনেকেই নির্বাচনের দিন ঘর থেকে বের হতে ভয় পেত। কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভয়ভীতি, বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা-এসব যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। চব্বিশ সেখানে ছেদ ফেলেছে। অনিয়ম

আর ক্ষমতার দৌরাত্ম্যের পর মানুষ একধরনের মুক্তি অনুভব করেছে। সেই আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিবর্তন এসেছে, সেছে, আর সেই সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের মনে ফিরে এসেছে সেই পুরোনো নির্বাচনি উৎসবের স্মৃতি, সেই প্রত্যাশা। মানুষ আবার আশা করতে চাইছে, নির্বাচন যেন তাদের ভোটে, তাদের অংশগ্রহণে হয়। কিন্তু, বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনকে ঘিরে যে অনিয়ম-সহিংসতা চলেছে, তা রাতারাতি দূর হয়ে যাবে?

প্রতিপক্ষকে দমনে সন্ত্রাসীদের ব্যবহারসহ নানা পুরোনো কাণ্ডকীর্তি তো সামনেই ঘটছে। তাই সঠিক নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রশ্নে সশস্ত্র বাহিনীর আবশ্যকতার কথা উচ্চারণ হচ্ছে ঘুরেফিরে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ইতিহাসগতভাবেই সংকটময় মুহূর্তে ভরসার জায়গা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে জাতীয় জরুরি মুহূর্ত-এমন সব ক্ষেত্রে মানুষ তাদের অপেক্ষাই করে। তা নির্বাচনকালীন নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও। তাদের বিশ্বাস সেনাবাহিনী মাঠে থাকলে কেন্দ্র দখল বা জোরজবরদস্তি থাকবে না। সেনাবাহিনীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া, সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষণ এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত উপযোগী। সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, নিরাপদ নির্বাচন আয়োজনে তাই সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যাবশ্যক। সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা, পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচনে ভোট কারচুপি ও সহিংসতা প্রতিরোধ সম্ভব। একদিকে এমন উচ্চাশা, অন্যদিকে মতলবি মহলের উদ্বেগ। সেনাবাহিনী তৎপর থাকলে তারা সমস্যায় পড়ে যাবে, তা বুঝতে পেরে নানা বাঁকা পথ আরো বেশি করে খুঁজছে। সেনাবাহিনীকে নিয়ে গুজব, বিভ্রান্তি তৈরি করার বাতিকে ঘুরছে। এরা জানে, সেনাসম্পৃক্ততায় নির্বাচনকে অবাধ-সুষ্ঠু করার পথরেখা এদের সব নিশানা বরবাদ করে দেবে। তাই সুযোগ না পেলেও সেনাবাহিনীকে চটানো ও বিব্রত করার সুযোগ খোঁজে এরা।

করবে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও প্রশাসনের সমন্বিত কমান্ড স্ট্রাকচার দ্রুত প্রতিক্রিয়াসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, যা একটি শান্তিপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন উপহার দিতে সহায়ক হবে। নির্বাচনে কারচুপি, জালিয়াতি অনেকটাই ঐতিহ্যগত। বিগত ফ্যাসিস্টরা সেখানে ধারণাতীত নয়া মাত্রা যোগ করেছে। বিনা ভোট, রাতের ভোট, আমি-ডামি মিলিয়ে সব ম্যাচাকার করে নির্বাচনকে একটা মশকরায় এনে টেকানোর হিম্মত দেখিয়েছে তারা। সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে দেশের শাসনব্যবস্থার।

টানা গত তিনটি নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে রাখা হয়েছিল স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে। সেনাবাহিনীকে নির্বাচনে সম্পৃক্ত করা হলে চিত্র ভিন্ন হতে পারত। এবার একদিকে জন-আকাঙ্ক্ষা, আরেক দিকে মাঠের বাস্তবতা বুঝে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোর একটি সুযোগ ও বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত নির্বাচনগুলোর নানা ত্রুটিবিচ্যুতি, দখলবাজির পর ১৯৯১ সালে তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের সুষ্ঠু নির্বাচনের সদিচ্ছা নিয়েও এমন ভাবনা ও সংশয় ছিল। উৎকণ্ঠা ছিল তখনকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি রউফেরও। তবে বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সুষ্ঠু-অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের নজির তৈরি হয় ১৯৯১ সালে। ঐ নির্বাচনে সেনাবাহিনীর নেপথ্য ভূমিকা উহ্যই ছিল।

এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে স্বাধীন দেশে প্রথম স্বাধীন নির্বাচনের স্বাদ পায় মানুষ। এবার সেই রকম বা সম্ভব হলে আরো ভালো কিছুর আশা মানুষের। আর সেই আকাঙ্ক্ষার একটা বড় মাধ্যম সশস্ত্র বাহিনী। যার প্রতিফলন প্রধান উপদেষ্টার কণ্ঠেও। তার ইচ্ছা অভিপ্রায় দৃষ্টে চমৎকার একটি নির্বচনের জন্য উন্মুখ মানুষ। এ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় নেবে অন্তর্বর্তী সরকার-এই অপেক্ষায় নির্বাচনমুখী দল ও ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহী মানুষ।

লেখক: সাংবাদিক

ইত্তেফাক/এমএএম