আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাবনার পাঁচটি সংসদীয় আসনে প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। জেলার বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি জেলায় মজবুত। তবে বিগত আওয়ামী লীগের সময় বিএনপির ভোট বয়কট ও কারচুপির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কব্জায় ছিল সব আসন। হামলা-মামলা ও অত্যাচারের কারণে বিএনপি মাঠেও কোণঠাসা ছিল। হাসিনা পতনের পর আবার দলকে সংগঠিত করেছেন বিএনপির নেতারা।
এদিকে, জেলার ৩ ও ৪ আসনে প্রার্থিতা নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে অসন্তোষ রয়েছে। প্রার্থী বদলের দাবিতে ইতিমধ্যে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন দুটি আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নেতাকর্মী সমর্থকরা। প্রার্থী পরিবর্তন না হলে নিজ দলের বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর সাথে ভোটযুদ্ধ হবে বিএনপি প্রার্থীর।
অন্যদিকে ৯-১০ মাস আগে থেকে দলীয় প্রার্থী নিয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীরা সব আসনে সংগঠিত হয়ে প্রচারণায় আছেন। সাধারণ ভোটারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি গণসংযোগ চালাচ্ছেন। ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণঅধিকার পরিষদ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণফোরাম মাঠে থাকলেও তাদের প্রচারণা তুলনামূলক ভাবে কম।
পাবনা-১ (সাঁথিয়া): আগে সাঁথিয়া উপজেলা ও বেড়া উপজেলার একাংশ নিয়ে ছিল এই আসনটি। তবে এবার সংশোধিত বিন্যাসে শুধু সাঁথিয়া উপজেলা নিয়ে এই আসনটি গঠিত হয়েছে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী দুই মেয়াদে এ আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির ও ১৯৯৬ সালে অসম্পূর্ণ মেয়াদে এ আসনে বিএনপির এমপি ছিলেন। ১৯৯৬ সালের জুন থেকে ২০০১ সাল এবং ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের দখলে।
এ আসনে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়ে এলাকায় সক্রিয় গণসংযোগ চালালেও, এখানে বিএনপি এখনো কোনো প্রার্থী মনোনীত করেনি। এ নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা হতাশা প্রকাশ করছেন।
বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব সালাহ উদ্দিন খান পিপিএম, উপজেলা আহ্বায়ক খাইরুন নাহার খানম মিরু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভিপি শামসুর রহমান, কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা মাসুদুল হক মাসুদ, সাংবাদিক ও টক শো ব্যক্তিত্ব এম এ আজিজ, মানবাধিকারকর্মী সাইয়েদ আবদুল্লাহ এবং যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক সরদার এম জাহাঙ্গীর হোসেন।
এখানে লড়াই হবে দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীষের মধ্যে। তবে এখানে জামায়াতের ভোট ব্যাংক থাকায় বিএনপি শক্তিশালী প্রার্থী না দিতে পারলে জামায়াতের প্রার্থীই এগিয়ে থাকবেন। অন্যান্য দলের প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল গণি। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আমজাদ হোসেন। এই আসনে এনসিপি এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫৫৩।
পাবনা-২ (সুজানগর-বেড়া): ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী এ আসনে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ আসনের সংসদ সদস্য ছিল বিএনপির। পরে ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হয়। এরপর ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচিত হন। সেই অর্থে ২৯ বছর ধরে আসনটি বিএনপির হাতছাড়া।
এবার সুজানগর ও বেড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপি দলীয় মনোনীত সম্ভাব্য প্রার্থী দুইবারের সাবেক এমপি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কে এম সেলিম রেজা হাবিব। জামায়াতের ইসলামী দলীয় মনোনীত প্রার্থী সুজানগর উপজেলা
জামায়াতের আমির অধ্যাপক মাওলানা হেসাব উদ্দিন। এই আসনে বিএনপির অবস্থান বেশ শক্ত। তবে জামায়াতও নিজেদের অবস্থান এগিয়ে নিয়েছে। তাই এবার লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে। মাঠের চিত্র হিসেবে এগিয়ে বিএনপি।
এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তেমন কারো নাম শোনা যাচ্ছে না। এই আসনে অন্যান্য দলের প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা আফজাল হোসেন ও খেলাফত মজলিসের মাওলানা আলতাব হোসেন, গণঅধিকার পরিষদের গোলাম সরওয়ার খান জুয়েল এবং এনসিপির মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬১ হাজার ৯০৭ জন।
পাবনা-৩ (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর): এ আসনে বরাবরই আওয়ামী লীগের দাপট বেশি ছিল। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন মকবুল হোসেন। এর আগে ১৯৯১ সালে বিএনপির সাইফুল আযম ও ২০০১ সালে বিএনপির কে এম আনোয়ারুল ইসলাম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মাঝে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ওয়াজি উদ্দিন খান নির্বাচিত হন। দুই যুগ ধরে হাতছাড়া আসনটি পুনরুদ্ধারে এবার জোরেশোরে মাঠে নেমেছে বিএনপি।
এ আসনে বিএনপির মনোনীত সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ দলের অন্যান্য মনোনয়নপ্রত্যাশী চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসাদুল ইসলাম হীরা এবং জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা হাসানুল ইসলাম রাজা।
সম্ভাব্য প্রার্থী পরিবর্তন এবং স্থানীয় প্রার্থীর দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন আনোয়ারুল ইসলাম এবং হাসাদুল ইসলাম হীরা ও তার সমর্থিত নেতাকর্মীরা। প্রার্থী পরিবর্তন না হলে নিজেদের মধ্যে কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে।
এ আসনে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা চাটমোহর। কারণ ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার ভোটার মিলিয়ে যে ভোটার তার চেয়ে বেশি ভোটার শুধু চাটমোহর উপজেলায়। তাই চাটমোহর উপজেলার প্রার্থীর দিকে চোখ সাধারণ মানুষের। এ আসনে একক প্রার্থী হলে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে হবে ভোট যুদ্ধ। তবে চাটমোহরের কোনো প্রার্থী যদি স্বতন্ত্র প্রার্থী হন সেক্ষেত্রে ভোটযুদ্ধ হবে জামায়াত বনাম স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে। মাঠের চিত্র বলছে সেক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে স্বতন্ত্র প্রার্থী। কারণ অন্য এলাকার প্রার্থীকে এই আসনে যুক্ত করেছে বিএনপি।
অন্যান্য দলের প্রার্থীরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক মাওলানা মো. আলী আছগার। তিনি ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাসিন্দা ও উপজেলা জামায়াতের আমির। গণফোরামের সরদার আশা পারভেজ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুফতি মো. মফিজ উদ্দিন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা আলহাজ মো. আবদুল খালেক এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) খন্দকার আক্তার হোসেন লেবু। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪ জন।
পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া): এ আসনে ১৯৯১ সালে বিএনপির সিরাজুল ইসলাম সরদার জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনে সিরাজুল ইসলাম সরদার পুনরায় নির্বাচিত হন। তবে একই সালের জুন মাসের নির্বাচন থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ আসনে টানা বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এর মধ্যে ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন প্রয়াত ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। দলীয় কোন্দল আর গ্রুপিংয়ের কারণে ২৯ বছর ধরে আসনটিতে জিততে পারছে না বিএনপি।
এই আসনে বিএনপির দলীয় মনোনীত সম্ভাব্য প্রার্থী বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব। এখানে শক্তিশালী একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু। যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ট্রেনবহরে হামলা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে দীর্ঘ বছর কারাভোগ করেছেন। তিনি ও তার সমর্থক নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রার্থী পরিবর্তন করা না হলে তিনি জাকারিয়া পিন্টু স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন।
এই আসনে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী হলেন জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আবু তালেব মণ্ডল। আটঘরিয়া উপজেলায় জামায়াতের ভোট ব্যাংক রয়েছে। আর ঈশ্বরদীতে বাড়ি হওয়ার সুবাদে সেখানেও আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে জামায়াতের অবস্থানও বেশ শক্ত। বিএনপির কেউ স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী না হলে এই আসনে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে লড়াই জমে উঠবে।
অন্যান্য দলের প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা আনোয়ার হোসেন, খেলাফত মজলিসের মাওলানা আল আমিন, এনসিপির অধ্যক্ষ আব্দুল মজিদ। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯ হাজার ৮৫৮ জন।
পাবনা-৫ (সদর): পাবনার অন্যতম আসন পাবনা-৫। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। এর আগে ২০০১ ও ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা আব্দুস সোবহান নির্বাচিত সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল ছাড়া এ আসনে বিএনপির কেউ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি। ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে ২০০০ সালের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে মাজহার আলী কাদেরী নির্বাচিত হন।
দুই যুগের অধিক সময় ধরে হাতছাড়া এই আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি। এই আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের নাম ঘোষণা হয়েছে। আর এক সময় জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী করা হয়েছে প্রিন্সিপাল মাওলানা ইকবাল হুসাইনকে।
দল ও প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে আছেন শিমুল বিশ্বাস। তার প্রতিষ্ঠিত ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি গরিব ও দুস্থদের সেলাই মেশিন, গরু, ছাগল, শীতবস্ত্র বিতরণ, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুদান প্রদান করে সাধারণ মানুষের পাশে থাকছেন সবসময়।
অন্যদিকে, জামায়াতের আলাদা ভোট ব্যাংক থাকায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশা করছেন দলটির সমর্থকরা। এই আসনে অন্যান্য দলের প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি নাজমুল হাসান, খেলাফত মজলিসের মুফতি ওয়ালী উল্লাহ এবং এনসিপির রওশন আলম। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩১ জন।

