আমাদের পথে-ঘাটের নীরব হিরোদের অজানা গল্প

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১৬:৫০

আমাদের দিনের শুরু হওয়ার আগেই ঢাকা সহ দেশের নানা শহরের রাস্তায় একদল নীরব কর্মযোদ্ধা কাজ করে। হাতে ঝাড়ু, ময়লার গাড়ি আর বালতি নিয়ে তারা রাস্তাঘাট, ড্রেন আর ময়লার ভাগাড় পরিষ্কার করে- যে কাজগুলো আমরা সাধারণত এড়িয়ে চলি। এর মধ্যে স্যানিটেশান কর্মীদের ড্রেনের গভীরে নামা থেকে শুরু করে সুয়ারেজ নামা, ম্যানহলে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা সহ আরও বহু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে। শহরকে বাসযোগ্য রাখতে প্রতিদিন নিজেদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলছে। অথচ তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা খুব কমই আমাদের নজরে আসে।

বাংলাদেশে প্রায় ৬ লক্ষ পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য সংগ্রহকারী কর্মী রয়েছে। যাদের অনেকেই সামাজিকভাবে সুবিধা বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার আর ইতিহাস তাদের নাম দিয়েছে 'অদ্ভুত'। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই কাজ তাদের পরিবারের দায়িত্ব হিসেবে এসেছে- ইচ্ছে নয় প্রয়োজনই যেন তাদের এই পেশায় রেখেছে।

তাদের কাজ সহজ নয় প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করতে হয়। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই তারা নোংরা পয়নিষ্কাশন, ক্ষতিকর গ্যাস এবং বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করেন। রিসার্চগেটে প্রকাশিত বাংলাদেশের বর্জ্য সংগ্রহকারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ৬০% কর্মীর নেই মাস্ক, ৭১% এর নেই গ্লাভস এবং ৭৫% এর নেই কোন বুট জুতা। ফলে তারা কলেরা, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসসহ নানা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। কাজ শেষে বাড়িতেও পরিস্থিতি খুব একটা ভিন্ন নয়ঃ ৬৫% পরিবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে, ৮১% নিরাপদ পানির অভাব এবং ৫৮% এর নেই সঠিক পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা। অথচ এসব সমস্যা সমাধানযোগ্য- সঠিক সুরক্ষা উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কর্মীদের নিরাপদ রাখতে পারে। আর উন্নত বাসস্থান, পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচী ও সুরক্ষা কর্মসূচী তাদের পরিবারের জীবনযাত্রাকে অনেকটাই বদলে দিতে পারে।

এই ক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টরের উদ্যোগ বড় ভূমিকা রাখতে পারে- যদি পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে আসে। অর্থ বা উদ্ভাবনই যথেষ্ট নয়- যাদের জন্য কাজ করা হচ্ছে তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পরিছন্নতা কর্মীদের অংশগ্রহণ ও সম্প্রদায়ের নেতৃত্বকে একসাথে নিয়ে সমাধান তৈরি করলে উদ্যোগগুলো বাস্তবেই কার্যকরী হয়। পাশাপাশি কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা'র (সিএসআর) উদ্যোগ তখন শুধু আর ব্যানারের লোগো থাকে না বরং নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষার পথ তৈরি করে।

হারপিক বাংলাদেশ এবং সাজিদা ফাউন্ডেশনের চলমান উদ্যোগ একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। গত বিশ্ব টয়লেট দিবসে ১,০০০ পরিছন্নতাকর্মী ও তাদের পরিবারকে দেওয়া হয় স্বাস্থ্যসেবা কার্ড। যার মাধ্যমে ২৫০ টিরও বেশি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে তারা। এছাড়াও শিশুদের দেওয়া হয় 'দিপু- টুশি হাইজিন অভিযান' কমিক বই ও অ্যানিমেশন সিরিজ যেখানে হাইজিন, টয়লেট পরিচ্ছন্নতা, হাতধোয়া এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের শিক্ষা রয়েছে-যা অনেক বাবা-মা আগে কখনো শেখার সুযোগ পাননি। এই উদ্যোগ কর্মীদের জীবনে স্বীকৃতি, আশা এবং সম্মান নিয়ে এসেছে।

এ বছর এই কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে- এতে যুক্ত হয়েছে আরও ২,০০০ পরিছন্নতা কর্মী ও তাদের পরিবার। বিশেষজ্ঞ, সরকারিকর্মকর্তা, এনজিও এবং কর্পোরেট ব্যাক্তিত্বরা একত্রে স্যানিটেশনকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং পাবলিক-প্রাইভেট যৌথ উদ্যোগে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। 'দিপু-টুশি'র' নতুন অধ্যায় ও ডিজিটাল কার্টুন সিরিজ সারা দেশের আরও শিশুদের কাছে পৌঁছাবে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা নিশ্চিত করবে।

একা পরিবর্তন সম্ভব না প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সরকার, সম্প্রদায়, উন্নয়ন কর্মী এবং দায়িত্বশীল কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান সবাই মিলে কাজ করলে এই অদেখা সুপার হিরোদের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন আনা সম্ভব। সিএসআর শুধু একটি ইভেন্ট বা কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়- সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে এটি গড়ে তুলতে পারে নিরাপদ, সম্মানজনক এবং স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ।

চৌধুরী নাঈম আহমেদ মুজিব
লেখক একজন বেসরকারি সংস্থার কনসালট্যান্ট

ইত্তেফাক/এএম