মাটি লবণাক্ততায় বাড়ছে ক্ষতি

বাগেরহাটে চিংড়ি চাষ: কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৮:২৩

গত এক দশকে উপকূলীয় এলাকা বাগেরহাটে সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি চাষে বদলেছে জীবন ও জনপদের চিত্র। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে বাগেরহাটের চিংড়ি। চলতি অর্থবছরে এই অঞ্চলে চিংড়ি থেকে আয় প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। চিংড়ি উৎপাদনে সামগ্রিকভাবে শুধুমাত্র লাভের কথা বলা হলেও ভিন্ন সুরে কথা বলছেন ওই এলাকার কৃষক ও পরিবেশবাদীরা।

তারা বলছেন, বাগেরহাটে অপরিকল্পিতভাবে একের পর এক চিংড়ির ঘের গড়ে ওঠায় একদিকে কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। অন্যদিকে বাগেরহাটের যেসব আবাদি জমিতে চাষ হচ্ছে সেগুলোতেও বাড়ছে লবণাক্ততা। এতে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয়রা। কাজেই চিংড়ি চাষ একদিকে যেমন কারো জীবন বদলে এনে দিয়েছে বিপুল সমৃদ্ধি। অন্যদিকে জমিতে লবণাক্ততা বাড়ায় বিপাকে পড়ছেন স্থানীয় কৃষকরা। সেই সঙ্গে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও খারাপ প্রভাব পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে চিংড়ি চাষ সাময়িক লাভ দিলেও তা পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি অফিস ও পরিবেশবিদরা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রামপাল, মোংলা, মোরেলগঞ্জ থেকে শুরু করে বাগেরহাট সদরের বিস্তীর্ণ চাষযোগ্য জমি রূপান্তরিত হয়েছে চিংড়ি চাষের পুকুরে। বড় লিজধারী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য এই পরিবর্তন বিশ্ব বাজারে ‘সাদা সোনা’ রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়ালেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট কৃষক ও দিনমজুরেরা। বহু পরিবার জমি হারিয়ে, দেনার বোঝা বাড়িয়ে এবং চাষাবাদের অনুপযোগী মাটি নিয়ে দিশেহারা।

মোরেলগঞ্জের পুটিখালী গ্রামের কৃষক সিদ্দিকুর রহমান রহমান জানান, আগে তার সব জমিতেই ধান হতো। এখন ২ দশমিক ৫ বিঘায় ধান চাষ করেন, বাকি ৫ বিঘা চলে গেছে বাগদা চিংড়ির ঘেরে।

একই উপজেলার তেলিগাতি গ্রামের কৃষক আলম শেখ জানান, তার পুরো ৫ বিঘা জমিই এখন চিংড়ি চাষে ব্যবহৃত হয়। ধান চাষ আর করেন না।

তিনি বলেন, এই চিংড়ি চাষে বাণিজ্যিক সাফল্যের পেছনে আছে ক্ষতির গল্প। আশপাশের ঘের থেকে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে হাজারো কৃষকের জমি নষ্ট হয়েছে। ধানের ফলন কমে যাওয়ায় অনেককে কম দামে জমি লিজ দিতে বাধ্য হতে হয়েছে।

২০২৪ সালে খুলনার মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) এবং বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, বাগেরহাটের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা গত এক দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন চিংড়ি ঘের বিস্তৃতি এ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পশুর, দড়াটানা, পনগুছি ঘষিয়াখালী নদীর লবণাক্ততা শুষ্ক মৌসুমে (মার্চ–এপ্রিল) ১৫–৩০ ডেসি-সিমেন্স/মিটার পর্যায়ে উঠে যায়, যা ধানসহ অধিকাংশ ফসলের সহন ক্ষমতার বহুগুণ বেশি।

বাগেরহাট ২০২০ সালে জেলার মোট কৃষিজমি ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৪১ হেক্টর; ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৬১ হেক্টরে। যদিও ফসল চক্রের অনুপাত (৬১ শতাংশ এক ফসলি, ২৭ শতাংশ দুই ফসলি, ১১ শতাংশ তিন ফসলি) প্রায় অপরিবর্তিত, তবে ক্রপিং ইন্টেনসিটি বেড়ে ১৫১ শতাংশ থেকে হয়েছে ১৫৪ শতাংশ। এই চিত্র এক ফসলি জমির আধিক্য এবং লবণাক্ততা বাড়লে এ জমিগুলো সহজেই ঘেরে পরিণত হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেয়।

‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ খুলনা বিভাগের সমন্বয়কারী ও পরিবেশবিদ শেখ নূর আলম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বাড়ায় কৃষিতে ধস নামে। ৮০ দশকে চালু হওয়া চিংড়ি চাষ কৃষির পরিবেশ পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে। ধান ছাড়াও সবজি, কলা সবই আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি জনস্বাস্থ্যের ওপর এর ক্ষতি পড়ছে।

তার মতে, চিংড়ি রপ্তানি করে বছরে ৩–৪ হাজার কোটি টাকা আয় করলেও কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে এর ক্ষতির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তাই পরিকল্পনা ছাড়া চিংড়ি চাষ বন্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাগেরহাটে বাগদা চিংড়ি চাষ হচ্ছে ৫২ হাজার ৫৫১ হেক্টর জমিতে, উৎপাদন ২০ হাজার ৯৪০ মেট্রিকটন। গলদা চাষ হচ্ছে ১৯ হাজার ৭৭৩ দশমিক ৩ হেক্টরে, উৎপাদন ১৯ হাজার ৭১৬ দশমিক ৩ মেট্রিকটন। এই হিসাবে চলতি অর্থবছরে চিংড়ি থেকে আয় প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। যা দেশের মোট চিংড়ি আয়ের প্রায় সমান (গত অর্থবছরে আয় হয় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা)।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মতাহার হোসেন বলেন, শিল্পায়ন, শহরায়ণ এবং নদীর লবণাক্ততা বৃদ্ধিই চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়ার মূল কারণ। তার ভাষায়, নভেম্বর থেকেই লবণাক্ততা ঢুকতে শুরু করে, যা আগে জানুয়ারি মাসে হতো। এতে মার্চ–এপ্রিলের দিকে ফসল মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় লবণ সহনশীল ফসলের প্রচলন ও এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি ব্যবস্থায় আনতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।

তিনি আরও জানান, অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে জমি ঘের বানাতে বাধ্য করা হচ্ছে। যা সাময়িক লাভ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে

ইত্তেফাক/এপি