ছায়া থেকে আলোয় নারী শ্রমিকরা: অধিকার, স্বীকৃতি ও সংস্কারের দাবি

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:০০

বাংলাদেশের বৃহৎ অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমশক্তির ৮৫ শতাংশই নারী। দীর্ঘদিন ধরে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সত্ত্বেও কর্মপরিসংখ্যান, নীতিমালা ও স্বীকৃতির বাইরে রয়ে গেছেন। বুধবার (১০ডিসেম্বর) রাজধানীতে আয়োজিত ‘ছায়া থেকে নেতৃত্ব’ অনুষ্ঠানে এই নারীরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন।

গৃহকর্মী, চাবাগানের শ্রমিক, মৎস্যখাতের কর্মী এবং ঘরে বসে পোশাক উৎপাদনকারী নারী শ্রমিকরা বৈষম্যের অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তাহীনতা, পরিচয় ও অধিকার চ্যালেঞ্জ এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তারা সরাসরি সরকার, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষদের সামনে তাদের বাস্তবতা ও দাবি উপস্থাপন করেন, যা অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনা উত্থাপন করে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় এবং ৩৩টি সুশীল সমাজ অংশীদারের সাথে নিয়ে ওক্সফ্যামইন বাংলাদেশ ‘বাংলাদেশে সুশীল সমাজের মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন’ প্রকল্পেরআওতায় অনুষ্ঠানটি আয়োজনকরে।

অনুষ্ঠানে যে তথ্যগুলো তুলে ধরা হয় সেগুলো হলো—মাত্র ০.৭৩ শতাংশ নারীর আনুষ্ঠানিক কর্মচুক্তি আছে, ৮৫ শতাংশ নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয় এবং বেশিরভাগ কখনোই কোনো সুশীল সমাজ সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হননি। এসব তথ্য নীতির গভীর ঘাটতি ও নারী শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অদৃশ্যতার স্পষ্ট প্রমাণ। তবে ‘বাংলাদেশে সুশীল সমাজের মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন’ প্রকল্প গত পাঁচ বছরে এই ধারা বদলে দিয়েছে—নারীরা নেতৃত্বে আসছে, সম্মিলিতভাবে সংগঠিত হচ্ছে এবং যেসব প্রতিষ্ঠান একসময় তাদের উপেক্ষা করত, সেসব প্রতিষ্ঠানেও এখন তারা সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছেন।

অনুষ্ঠানে বরিশালের গৃহকর্মী পুতুল আখতার বলেন, ‘এই প্রকল্প আমাকে আমার অধিকার সম্পর্কে জানানোর আগ পর্যন্ত আমি জানতামই না যে আমার নিজের একটি পরিচয় আছে। একসময় আমাদের হেয় করা হতো, আমরা ছিলাম আড়ালে। এখন আমরা আইনি স্বীকৃতি, কর্মচুক্তি এবং প্রতিটি শ্রমিকের প্রাপ্য মর্যাদা দাবি করছি।’

সিলেটের চা শ্রমিক শীলা কুর্মি বলেন, ‘আমরা জীবনধারণযোগ্য মজুরি, শ্রম আইন বাস্তবায়ন, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ ও শিক্ষার দাবি জানাই—অনুগ্রহ হিসেবে নয়, অধিকার হিসেবে। আমাদের কথা এখন শোনা হচ্ছে; তাই আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে আমরা বিচ্ছিন্নতা থেকে অধিকার দাবির পথে এগিয়ে যেতে পারি।”

সারাদিন বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, আইনগত সংস্কার ছাড়া কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) নির্বাহী পরিচালক ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এই চারটি খাতে নারী শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা খুবই সীমিত। এ জন্য আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য সংগঠনও দরকার, আন্দোলনও দরকার।’

এক ভিডিও বার্তায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার বলেন, ‘চা বাগান শ্রমিক, মৎস্যজীবী, গৃহকর্মী এবং ঘরে বসে পোশাক উৎপাদনকারী নারীরা প্রান্তিক। পরিচয় প্রদান ও নীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের অবদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। জনমানসের পরিবর্তন এবং মিডিয়ার সম্পৃক্ততাও বাড়াতে হবে—যাতে অধিকার শুধু কাগজে না থাকে, বাস্তবে প্রয়োগ হয়।’

বাংলাদেশে ইইউ প্রতিনিধি দলের উন্নয়ন সহযোগিতা প্রধান মিহাল ক্রেজা বলেন, ‘‘বাংলাদেশে সুশীল সমাজের মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন’’ প্রকল্পের নারীরা অসাধারণ প্রভাব ফেলছেন, যা অধিকার বাস্তবায়নকারী ব্যবস্থাগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছে। শ্রমিকদের অগ্রগতি স্পষ্ট হলেও যাত্রা এখনও অসম্পূর্ণ। স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য দরকার শক্তিশালী বাস্তবায়ন, বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি নারী নেতৃত্ব এবং স্থানীয়ভাবে পরিচালিত সংস্কার—যাতে প্রতিটি নারী আলোতে দাঁড়াতে পারেন।’

ওক্সফাম ইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আশিস দামলে বলেন, ‘মানুষ যখন জাগে, তখন বলার অনেক কিছু থাকে, আর করার থাকে আরও বেশি। প্রযুক্তির ব্যবহার ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা এখন সম্ভাবনার নতুন পর্যায়ে আছি। টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ হলো—সহায়তার ওপর নির্ভরতা থেকে স্বনির্ভরতার দিকে অগ্রসর হওয়া।’

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘ফোরাম, অংশীদারিত্ব এবং রাজনীতিবিদদের সঙ্গে অর্থবহ সংযোগ এখন অত্যন্ত জরুরি—যাতে জাতীয় নির্বাচনী অঙ্গীকারে নারী শ্রমিকদের অধিকার স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।’

ইত্তেফাক/এএম