পূর্ব প্রকাশের পর
১৯৫০ সালে জর্জ বার্নার্ড শ’র মৃত্যুর পর আজ অর্ধশতাব্দীর বেশি বিগত। অথচ ইংরেজী ভাষার বানানের অঙ্গে তেমন হস্তক্ষেপ আজো দৃষ্টিগোচর নয়। এখনও সে ভাষায় ‘ঘোটি’ লিখে ‘ফিশ’ উচ্চারণ চলছে : অর্থাত্ বানান করা হচ্ছে এক রকম, উচ্চারণ করা হচ্ছে আরেক রকম— যেমন ‘কাবাড্’ (cupboard)। নজিরটি টেনে আমি বলতে চাচ্ছি যে উচ্চারণের মোহে অন্ধ হয়ে শব্দের অঙ্গে চঞ্চল এবং ব্যাপক হস্তাবলেপ ভাষাকে সচল করে না : করে বরং বিশৃঙ্খল।
চেনামহল বলে : বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত আমার ‘মহামহিম রবীন্দ্রনাথ’-নামক গ্রন্থটির শিরোনাম অনান্তরিক যেহেতু তাঁর অনুকরণে আমি ‘বাঙালি’ লিখি না। আমি বলি : আপাদশির আমার দাস্তগীর, রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণানুগ বানান চান বলে— নবেম্বর, গবর্মেণ্ট, মানচি, চালাচ্চি, করলেম, এলুম, মিলচি নে ইত্যাদি লেখেন। আমরা তো লিখি না। তাঁর মতো ‘কালেজে’ গিয়ে আমরা ‘কাপি’ও করি না। কারণ উচ্চারণ বদলে যায়— স্থানভেদে, কালভেদে, পাত্রভেদে।
উচ্চারণের পিছু নিলে শব্দটি কালে কালে অজ্ঞাতপরিচয় হয়ে যেতে পারে। এই ভয়েই ইংরেজী ভাষায় পঞ্চদশ শতকের ‘গ্রেট ভাওয়েল শিফ্ট’-এর পরে knife ও night এর k ও gh ইত্যাদির উচ্চারণ লোপ পাওয়া দেখে ভাষাবিদ্গণ উত্স থেকে হরফ যোজন করে শব্দের পরিচয় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন, যার ফলে—পূর্বেকার doute-শব্দটির সঙ্গে ল্যাটিন উত্স dubitare-এর b হরফটি যোজনাক্রমে doubt-শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে ষোড়শ শতকে। আসলে তিনি তাঁর নাম উচ্চারণানুগ ‘রোবিন্দ্রোনাথ’ লিখেননি (কথাটি উল্লেখ করে মণীন্দ্রকুমার ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন ‘উচ্চারণপন্থীরা সর্বত্র দৃষ্টি দিচ্ছেন না কেন?’, বাংলা বানান, পৃ ৩১), আমিও তাই আমার জাতি উচ্চারণানুগ ‘বাঙালি’ লিখি না।
বস্তুত ইকার-ঈকার নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই। রবীন্দ্রনাথের ‘পথে চলে যেতে যেতে’-গানটির (গীতবিতান, পৃ ২৩৫, বিশ্বভারতী, ১৩৮০ সং) প্রথম অন্তরাতে— ‘কি অচেনা কুসুমের গন্ধে, কি গোপন আপন আনন্দে’,— ই-কার সংবলিত ‘কি’ লেখা পাচ্ছি বামের পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রস্বাক্ষরিত রবীন্দ্রহস্তলিপিতে। অথচ মুদ্রিত ডানের পৃষ্ঠায় একই গানের একই কথায় ‘কী’ পাচ্ছি ঈ-কারসংবলিত। রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষরের ‘কি’ এবং বিশ্বভারতীর মুদ্রণের ‘কী’র এই মুখোমুখি অবস্থানে আপনি কোন্খানে যাবেন?
হ্রস্ব-ইকার দীর্ঘ-ঈকার প্রসঙ্গে ১৮৮৫ সালের ‘শব্দতত্ত্ব’-যুগ থেকে ১৯৩৮ সালের ‘বাংলাভাষা-পরিচয়’-কাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন আর যা করেছেন তার মধ্যে স্ববিরোধিতা ছিল নানাবিধ। বলেছেন ‘প্রাকৃত বাংলা’য় দীর্ঘ-ঈকার নেই, তাই তিনি ‘মাসি’ লিখেছেন। কিন্তু আমার জানামতে ‘শালি’ লেখেননি, লিখেছেন বরং ‘শ্যালী’। তিনি বলেন দীর্ঘ-ঈকার সংস্কৃত ভাষার, অথচ সংস্কৃত ‘ঘটী’-কে তিনি লেখেন ‘ঘটি’।
১৯৩৭ সালের ২৯ জুন রবীন্দ্রনাথ অধ্যাপক দেবপ্রসাদ ঘোষকে লিখেছেন যে বানান সংস্কারকল্পে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রস্তাব দেন তিনি তদ্ভব শব্দের ব্যাপারে, তত্সম শব্দের বানান তিনি মানেন। অথচ রবীন্দ্রনাথ তত্সম শব্দের বানানও বদলেছেন প্রচুর (অভ্যেস, সুবিধে, বিদ্যে)। ‘শব্দতত্ত্ব’র (১৯০৯) ‘প্রাকৃত ও সংস্কৃত’ নিবন্ধে তিনি বলেন ‘কথিত বাংলা’ই প্রাকৃত বাংলা। প্রশ্ন উঠল : ‘কার কথিত’? তাঁর উত্তর : ‘কলিকাতা অঞ্চলের উচ্চারণকেই আদর্শ ধরিয়া লইতে হইবে। কারণ, কলিকাতা রাজধানী। কলিকাতা সমস্ত বঙ্গভূমির সংক্ষিপ্তসার’ (প্রবন্ধ : বাংলা উচ্চারণ, গ্রন্থ : শব্দতত্ত্ব)। মণীন্দ্রকুমারের মন্তব্য : কলকাতার বাগবাজার কালীঘাটের সকলের উচ্চারণ এক নয়— কলকাতাবাসী রবীন্দ্রনাথ-সুনীতিকুমার-চারু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ভাষাতাত্ত্বিকের, দানিবাবু-তিনকড়ি চক্রবর্তী-তারাসুন্দরী প্রভৃতি অভিনেতা-অভিনেত্রীর উচ্চারণে সামঞ্জস্য ছিল না।
আমার প্রশ্ন হল মাথা-কে মাতা, কথা-কে কতা, দেখি-কে দেকি, গেছি-কে গেচি, আছে-কে আচে, ছিল-কে ছ্যাল ইত্যাদি বনেদী কলকাতাবাসীর বিশিষ্ট উচ্চারণকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে লেখার মান বানানে রূপ আমরা কেন দেব। জটিলতা আরো বেড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ যখন অন্যত্র বলেন, ‘এই বইয়ে যে ভাষার রূপ আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি, তাকে বলে বাংলার চলিত ভাষা। আমি তাকে বলি প্রাকৃত বাংলা (ভূমিকা, বাংলাভাষা-পরিচয়, ১৯৩৮)। তাহলে চলিত ভাষা আর কথিত ভাষা কি এক? প্রমথ চৌধুরী ও রাজশেখর বসু বলেন : এক নয়। চলিত ভাষার অভিধানেও সম্পূর্ণ কথিত শব্দাবলীর স্থান হবার নয়।
বস্তুত রবীন্দ্রনাথ সর্বক্ষণই উচ্চারণপূজারী। তাঁর গদ্যে, কাব্যে, সংগীতে, সবকিছুতেই তিনি উচ্চারণের ‘জাদু’ লাগিয়েছেন। তাই তাঁর উচ্চারণ উপচে পড়ে শব্দের বানানকেও রাঙিয়ে দিতে চায়। হরফের বুনটে শব্দগঠন প্রথমত ব্যাকরণ এবং দ্বিতীয়ত রেওয়াজ শাসিত। ভাষার ভিত্তিভূমি, শব্দের লিখিতরূপও উচ্চারণের দখলীভূত হবার পরিণাম জেনারেশন-গ্যাপের চেয়েও বেশি বিপত্তিকর ল্যাঙ্গোয়েজ-গ্যাপের সৃষ্টি করবে।
রবীন্দ্রনাথের ‘শব্দতত্ত্ব’-গ্রন্থের ‘উচ্চারণ’-প্রবন্ধের ৬ষ্ঠ নিয়মানুযায়ী পোণ-ধোন-জোন-ক্ষোণ মোতাবেক উচ্চারণানুগ বানান লিখলে যে-‘নোতুন’ বাংলা ভাষার সৃষ্টি হবে— সে-ভাষায় বাংলার শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যিক বাক্পতি ‘রোবিন্দ্রোনাথে’র ক্ল্যাসিক সাহিত্যও সাধারণের পাঠের আওতায় থাকবে না, লুপ্ত ভাষার পাঠোদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞের গবেষণার বিষয় হয়ে যাবে (বাংলা বানান, মণীন্দ্র)।
বস্তুত রবীন্দ্রনাথের বানান নীতি ও রীতি বানানতাত্ত্বিকের নয়, উচ্চারণশিল্পীর। বানানতত্ত্ব বলতে চায় : বর্ণমালা লিখিতভাষাকে রেওয়াজ মোতাবেক বুনে যাবে। কেননা কোনো বর্ণমালাই কথিত ভাষার পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। মোটামুটি পারে কেবল দুটি ভাষার বর্ণমালা— জার্মান আর স্প্যানিশ। ইংলিশে তো ছাব্বিশটি বর্ণ দিয়ে চল্লিশটি প্রাথমিক ধ্বনি লিখতে হয়।
প্রচলিত বাংলা বর্ণমালাও প্রয়োজনীয় সকল উচ্চারণ লিপিবদ্ধ করতে পারে না। দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। বক্র ‘আ’ বা বিকৃত ‘এ’ ধ্বনিটি সংস্কৃত ভাষায় নেই, তাই সেই ধ্বনি প্রকাশক কোনো বর্ণও সংস্কৃত বর্ণমালায় নেই। ফলে বাংলা ভাষায়ও ধ্বনিটির প্রতীক কোনো বর্ণ নেই— যদিও বাংলা ভাষায় ধ্বনিটি আছে (বাংলা ভাষায় শুদ্ধ স্বরধ্বনি সাতটি— অ, আ, ই, উ, এ, অ্যা, ও। অথচ বর্ণ আছে ছয়টি, ‘অ্যা’ কোন বর্ণ নয়)। রাজশেখর বসু এই ধ্বনিটি বোঝানোর জন্য একটি নূতন স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে তার যোজ্য চিহ্ন উদ্ভাবন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথও চিহ্ন দুটি পছন্দ করেছিলেন। হয়তো সমকালীন বানান-সংস্কার-সমিতিতে সেই সংস্কার প্রস্তাবটি তোলার সাহস কারো হয়নি, নয়তো উত্থাপিত প্রস্তাবটি সমিতি কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েছে। অথচ ওটিই ছিল প্রকৃত এবং অপরিহার্য বানান সংস্কার।
বলতে চাচ্ছি— ভাষার শিকড়গুলি এমনি গভীরে প্রোথিত থাকে যে সেগুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করা স্বয়ং রবীন্দ্র-রাজশেখরেরও সাধ্যের অতীত ছিল বলেই প্রতীয়মান হয়। অথচ শব্দের বুনট তথা বানান নিয়ে অনেকে আজকাল কত সহজেই-না নাড়াচাড়া করেন।
প্রবন্ধটিতে লেখকের নিজস্ব বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে
