বর্তমান পৃথিবী আজ প্রকৃত অর্থেই এক গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হইয়াছে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় কল্যাণে বিশ্বনাগরিক হইয়া ওঠা এখন সহজতর হইয়াছে। ইহাতে মানুষের সম্মুখে উন্নত ও পছন্দময় জীবনধারণের সুযোগ অবারিত হইয়াছে। যদিও ভাষা এখনো একটি প্রতিবন্ধক হিসাবে কাজ করিতেছে, তথাপি অদূর ভবিষ্যতে হয়তো বিদেশি ভাষা শিক্ষাগ্রহণ না করিয়াও যোগাযোগনির্ভর ভাবপ্রকাশ সম্ভব হইবে। বর্তমানে মোবাইল নানা অ্যাপসের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় যোগাযোগ রক্ষা করা যাইতেছে, যদিও তাহা ততটা সাবলীল নহে। ইহাতে দোভাষী রাখিবার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ ফুরাইয়া আসিতেছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।
ইহার পরেও, উন্নত মানের সভ্যতা সম্পর্কে জানা এবং আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের তৃষ্ণা মিটাইতে হইলে আজকাল বা অদূর ভবিষ্যতেও ইহার বাহন হিসাবে ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করিতে হইবে। জার্মানিসহ যেসব দেশ জাতীয় সকল ক্ষেত্রে মাতৃভাষা ব্যবহারের পক্ষপাতী, তাহারাও এই দৃষ্টিকোণ হইতে ইংরেজি শিখিবার ওপর গুরুত্বারোপ করিয়া থাকেন। এই জন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা গুড নেইবারস বাংলাদেশ সারা দেশে 'ন্যাশনাল ওয়ার্ডমাস্টার' প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধিতে ও শিক্ষার্থীদের ইংরেজিভীতি দূর করিতে কাজ করিয়া যাইতেছে। তাহাদের মতে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়া থাকিতে হইলে এখনো ইংরেজিতে দক্ষতা বাড়াইবার কোনো বিকল্প নাই।
প্রকৃতপক্ষে আগামী তিন-চার দশক পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব কতটা থাকিবে, তাহা লইয়া আলোচনা অপরিহার্য। যদিও পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব ক্ষয়িষ্ণু এবং চীন, ভারতসহ কয়েকটি দেশের আর্থিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান লক্ষণীয়, তথাপি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণে ইংরেজি ভাষা বিশ্বমঞ্চে স্বীয় স্থান ধরিয়া রাখিবে বলিয়া মনে করা যায়: যেমন-প্রথমেই বলা হইয়াছে; ইংরেজি এখনো জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার দখল করিয়া আছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা এবং ইন্টারনেট জগতে ইংরেজি ভাষার যে অবদান, তাহা সহজে অন্য কোনো ভাষার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হইবে না। গবেষণাপত্র, বৈজ্ঞানিক জার্নাল এবং প্রযুক্তিগত মানদণ্ডসমূহ প্রধানত ইংরেজিতেই রচিত ও প্রকাশিত হইতেছে। দ্বিতীয়ত তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির ফলে অনুবাদের ক্ষেত্রে অগ্রগতি আসিলেও, সূক্ষ্ম জ্ঞান, সাহিত্য এবং জটিল ধারণাগুলি সরাসরি মাতৃভাষায় আয়ত্ত করিবার জন্য ইংরেজি জ্ঞান আবশ্যক। কারণ যন্ত্রের অনুবাদ অনেক ক্ষেত্রেই শব্দের সঠিক ভাব বা সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনা প্রকাশ করিতে ব্যর্থ হয়। তৃতীয়ত বিশ্ববাণিজ্য, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আকাশপথের যোগাযোগব্যবস্থায় ইংরেজি বহুকাল যাবৎ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। এই জন্য চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক ব্যাবসায়িক পরিবেশে ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য শীঘ্র কমিবে না।
যদিও চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান উল্লেখযোগ্য, তথাপি চীনা ভাষা বা ম্যান্ডারিন কেবল চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চীনের প্রযুক্তি বা পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করিলেও, ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগের জন্য প্রায়শই ইংরেজিকে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করিতে হয়। সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও শিক্ষাগত কারণে চীনা ভাষা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইংরেজিকে প্রতিস্থাপিত করিতে পারিবে না বলিয়া ভাষা বিশেষজ্ঞগণ মনে করিতেছেন।
অতএব, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়া থাকিতে হইলে আগামী চার-পাঁচ দশকেও আমাদের ইংরেজি শিখিতে হইবে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রবেশ এবং জ্ঞানার্জনের জন্যও ইংরেজি আবশ্যিক। ইহা ছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক প্রকল্পে অংশগ্রহণ এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করিতে হইলে ইংরেজিতে দক্ষতা প্রথম ও প্রধান শর্ত। বিশ্বসাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও ইংরেজি সেতুবন্ধ তৈরি করিয়া থাকে। মোটকথা, বিশ্বায়নের যুগে একজন সফল বিশ্বনাগরিক হইবার জন্য ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করিতে হইবে। তথ্যপ্রযুক্তির যতই উন্নতি হউক না কেন, বৈশ্বিক মঞ্চে স্বীয় জ্ঞান ও মেধার স্ফুরণের জন্য ইংরেজি ভাষার এই গুরুত্ব আগামী দিনেও বজায় থাকিবে। এই কারণেই আমাদের জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে ইংরেজি শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা অত্যাবশ্যক। শিক্ষার্থীদের ইংরেজিভীতি দূর করিতে ভালো মানের শিক্ষক তৈরি এবং এই সংক্রান্ত সচেতনতামূলক নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়িয়া তুলিতে হইবে।

