সুন্দরবনে নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৯, ২১:২১

সুন্দরবনের অভ্যন্তরে মত্স্য দস্যুদের অপতত্পরতা যেন থামানোই যাচ্ছে না। প্রজননের ভরা মৌসুমে বনের গহীনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার বন্ধে বন বিভাগ জুলাই ও আগস্ট এ দুই মাসে জেলেদের মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করলেও এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলেছে এক শ্রেণির জেলে নামধারী মত্স্য দস্যু। এসব দস্যুরা বনের গহীনে গোপনে প্রবেশ করে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে মাছ আহরণের চলতি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের ঘটনায় গত ২৩ জুলাই সকালে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই (মোংলা) রেঞ্জের সূর্যমুখী খাল থেকে বিষ ও বিষ মিশ্রিত মাছসহ দুই দুর্বৃত্ত আটক হয় বনরক্ষীদের হাতে। এর আগে একই রেঞ্জ এলাকায় গত ১৫ ও ১৬ জুলাই পুলিশ এবং বন বিভাগের পৃথক অভিযানে সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের সময় চার জন আটক হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবনের ৩১ দশমিক এক পাঁচ ভাগ এলাকা জুড়ে রয়েছে বিশাল জলভাগ। এখানকার অসংখ্য খালে আছে প্রায় তিন শতাধিক প্রজাতির মাছ। বন বিভাগ থেকে অবশ্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কিছু খাল। এসব খালে সারা বছরই মাছ আহরণ নিষিদ্ধ থাকে। সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের চারটি রেঞ্জের আওতাধীন ১৮টি খালে সব ধরনের মাছ ধরার জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়। কারণ এই ১৮টি খালে মা মাছ অবস্থান নেয়।

সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত জেলে নামধারী এক শ্রেণির মত্স্য দস্যু অধিক লাভের আশায় সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করে থাকে। বিষ দিয়ে মাছ শিকার রোধে চলতি বছর জুলাই ও আগস্ট মাসে সুন্দরবনের অধিকাংশ খালে ও ছোটো নদীতে বন বিভাগ সব ধরনের মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু এর পরও থেমে নেই বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার। মাছ শিকারের জন্য হাতের নাগালেই পাওয়া যাচ্ছে বিষ বা কীটনাশক। কোনো নিয়মের বালাই যেন নেই।

জনতা এন্টারপ্রাইজ নামে মোংলা বাজারের সার ও কীটনাশক দোকানের মালিক সেলিম জানান, ডায়মগ্রো, ফাইটার, রিপকর্ড এবং পেসিকল নামের কীটনাশক কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য চাষিরা কিনে থাকেন। এগুলো দিয়ে সুন্দরবনের খালে মাছ মারা হয় কিনা তা তার জানা নেই বলে দাবি করেন। কৃষি বিভাগ অনুমোদন দেওয়ার পরই এই কীটনাশক বিক্রি করেন বলেও জানান তিনি।

সুন্দরবন সংলগ্ন স্থানীয়রা জানান, সুন্দরবনের ঢাংমারী, মরাপশুর, জোংড়া, ঝাপসি, ভদ্রা, নীল কমল, হরিণ টানা, কোকিলমুনী, হারবাড়িয়াসহ আশপাশ এলাকায় বন সংলগ্ন স্থানীয় অসাধু কিছু জেলে নামধারী মত্স্য দস্যু বিষ দিয়ে মাছ ধরছে। বেশি মুনাফার আশায় সুন্দরবনের বিভিন্ন নিষিদ্ধ খালেও বিষ দিয়ে মাছ শিকার করা হয়। বিষাক্ত পানি সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল থেকে ভাটার সময় নদীতে নেমে আসে। এ কারণে মাছ মরে যাওয়ায় এখন নদীতে আর ছোটো-বড়ো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া এ বিষ প্রয়োগের ফলে জীববৈচিত্র্যসহ পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার পরও সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের ধ্বংসযজ্ঞ থেমে নেই। বেশি মুনাফার আশায় সুন্দরবনের বিভিন্ন নিষিদ্ধ খালেও তারা বিষ দিয়ে মাছ শিকার করেন জেলেরা। জেলেদের দাবি, এই বিষ বাজারের যে কোনো কীটনাশক দোকান থেকে সংগ্রহ করা যায়।

মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান চিকিত্সক ডা. জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, বিষাক্ত পানির মাছ খেলে মানুষের পেটের পীড়াসহ কিডনি ও লিভারে জটিলতা দেখা দেয়। তিনি বিষ মিশ্রিত মাছ না খাওয়ার জন্য জনসাধারণকে সজাগ থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন।

মোংলা উপজেলা সিনিয়র মত্স্য কর্মকর্তা এজেডএম তৌহিদুর রহমান জানান, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এর ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ স্থানীয় জনগণকে আরো সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।

পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের (মোংলা) সহকারী বন সংরক্ষক মো. শাহিন কবির জানান, সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের প্রবণতা শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে কঠোর অভিযানে নেমেছে বন বিভাগ। বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার বন্ধে ইতিমধ্যে জনসচেতনতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বনের গহিনে বনরক্ষীদের টহল জোরদার করা হয়েছে।