ইত্তেফাক: ৭৩ বৎসরের সংশপ্তক

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:০০

ইত্তেফাকও আজ ৭৩ বৎসরে পা রাখিল। উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ৭৩ বৎসর একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠানের টিকিয়া থাকা কোনো সাধারণ ঘটনা নহে, তাহাও একটি মুসলমান পরিবারের হাতে। বিশ্ব জুড়িয়া প্রিন্ট সাংবাদিকতার যে দীর্ঘ ক্ষয়যাত্রা-সংকুচিত বিজ্ঞাপন বাজার, প্রযুক্তির আগ্রাসন, এজেন্ডা-কেন্দ্রিক সংবাদচর্চা-তাহার মধ্যেও একটি দৈনিক পত্রিকা প্রায় পৌনেশতক জুড়িয়া টিকিয়া রহিয়াছে, ইহাই বড় কথা।

আন্তর্জাতিক বাস্তবতা এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে। লন্ডনের 'দ্য টাইমস' (১৭৮৫) টিকিয়া থাকিলেও বিগত দশকগুলিতে একাধিক বার মালিকানা ও সম্পাদকীয় চরিত্র বদলাইতে বাধ্য হইয়াছে। 'নিউ ইয়র্ক টাইমস' (১৮৫১) ২০০৮-২০১২ সময়কালে গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়িয়া ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন মডেল গ্রহণ না করিলে হয়তো ইতিহাসের পাতায় স্থান লইত। 'দ্য গার্ডিয়ান' (১৮২১) নিজস্ব ট্রাস্ট থাকা সত্ত্বেও কর্মীছাঁটাই ও ব্যয়সংকোচন ব্যতীত অস্তিত্ব রক্ষা করিতে পারে নাই। ফ্রান্সের 'লে মঁদ' কিংবা জাপানের 'আসাহি শিম্বুন'-উন্নত রাষ্ট্রের এই সংবাদপত্রগুলিও পাঠকসংখ্যা ও প্রভাবের নাটকীয় পতনের সাক্ষী। পিউ রিসার্চ সেন্টার ও রিউটার্স ইনস্টিটিউটের তথ্য বলিতেছে-একবিংশ শতাব্দী শুরুর পর বিশ্বব্যাপী প্রিন্ট নিউজ রুমের অর্ধেকেরও অধিক বন্ধ হইয়াছে অথবা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হইয়াছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার এক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে ৭৩ বৎসর একটি দৈনিক পত্রিকার ধারাবাহিক অস্তিত্ব-ইহা নিঃসন্দেহে মিরাকল।

এই মিরাকলের মূলে রহিয়াছে একটি নিপাট সংবাদপত্রীয় আদর্শ ও দর্শন। 'ইত্তেফাক' শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ-মতৈক্য, ঐকমত্য, সমঝোতা, সম্প্রীতি, সামঞ্জস্য-ইহা কেবল শব্দার্থ নহে-ইহা একটি সাংবাদিক দর্শন। বিচ্ছিন্ন ঘটনাপ্রবাহ, ভিন্নমত ও বৈপরীত্যের মধ্য হইতে সত্যনিষ্ঠ সংবাদকে একত্রিত করিয়া সঠিক সংবাদ পাঠকসমাজের সামনে উপস্থাপন করাই ইত্তেফাকের মৌলিক অঙ্গীকার। ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক ও ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক রূপে আত্মপ্রকাশের সময় এই নাম নির্বাচন নিশ্চয়ই কাকতালীয় ছিল না-ইহা ছিল একটি সংবাদপত্রের আদর্শগত অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে যাহাদের অবদান ইতিহাসে অম্লান-তাহারা প্রাতঃস্মরণীয়। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া-ইহাদের প্রত্যেকের হাত ধরিয়াই ইত্তেফাক কেবল একটি পত্রিকা নহে, একটি জাতির মুখপত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের সৃষ্টির প্রতিটি স্তরে ইত্তেফাকের ভূমিকা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ-ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সময় ইত্তেফাক সংবাদকে কেবল লিপিবদ্ধ করে নাই-লিখিয়াছে গণমানুষের ইতিহাস।

তবে স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সাংবাদিকতা কখনো এক হয় না। স্বাধীনতার পর সাংবাদিকতার লক্ষ্য হওয়া উচিত উন্নয়নমূলক, নৈর্ব্যক্তিক ও জবাবদিহিমূলক সংবাদচর্চা। এই ক্ষেত্রেও বিগত ৫৪ বৎসরে ইত্তেফাক বহুক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করিয়াছে বলিয়া বিদ্বৎসমাজ স্বীকার করে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে সংবাদপত্রের সামনে যে বহুমাত্রিক চাপ-রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ক্ষমতার টানাপড়েন, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ-ইহাদের মধ্যেও সংবাদকে 'সংবাদ' হিসাবেই রাখিবার প্রয়াস বিস্ময়কর বটে। তবে এই বিস্ময়ের অন্তরালে রহিয়াছে আরেকটি কঠিন সত্য। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বে 'সংবাদপত্র' সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য-যথাযথ তথ্য সরবরাহ, ক্ষমতার জবাবদিহি ও নৈতিক জনমত গঠন-বিগত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী বিবর্তনের মুখে পড়িয়াছে। বহু ক্ষেত্রে সংবাদপত্র আর প্রতিষ্ঠান নহে-শক্তির এক্সটেনশনে পরিণত হইয়াছে। এই জন্য বহু সংবাদপত্রই সুকৌশলে তাহার এজেন্ডা প্রাধান্য দিয়াছে প্রকৃত সংবাদমূল্যের উপর। এই পরিবর্তন বর্তমানে সরাসরি উচ্চারণযোগ্য না হইলেও ভবিষ্যৎ ইতিহাসে ইহা উঠিয়া আসিবে নিঃসন্দেহে। এই প্রেক্ষাপটে কেবল 'সংবাদপত্র' হিসাবে ইত্তেফাকের ৭৩ বৎসরের যাত্রা একটি নীরব প্রতিরোধের গল্প। অনেক ঝড়ঝাপটা আসিয়াছে-কিন্তু আইস-বল এফেক্টের মতোই ইত্তেফাকের শরীরে জমিয়াছে অভিজ্ঞতার অমূল্য অলংকার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন- 'তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।' আল্লাহতা'লা বলিয়াছেন, 'আমি তোমাকে এমন ভার দেই না, যাহা তুমি বহন করিতে পারিবে না'। ৭৩ বৎসর একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে পতাকা বহন করিবার শক্তি থাকা নিশ্চয়ই 'মিরাকল'। ইহা কতদিন 'মিরাকল' থাকিবে আমরা জানি না। তবে অন্য কোনো 'পত্র' নহে-কেবল 'সংবাদপত্র' হিসাবে টিকিয়া থাকিবার যুদ্ধ ইত্তেফাক সংশপ্তকের মতো করিয়াই যাইবে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন