বংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই একটি সীমিত সামরিক শক্তির দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর দেশটি ধ্বংসপ্রায় অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে জন্মেছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে তৎকালীন বাংলাদেশের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দেশকে সীমানা সংরক্ষণে সক্ষম করা, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সামরিক আধুনিকায়নের কোনো সুসংগত পরিকল্পনা ছিল না।
সামগ্রিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, দেশের সামরিক ক্ষমতা প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনুরূপ দেশগুলোর তুলনায় যথেষ্ট পিছিয়ে।
বাংলাদেশের সামরিক ব্যয় গত দশকগুলোতে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধি মূলত বেতন, স্থায়ী খরচ এবং চলমান পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়েছে। তবে সামরিক আধুনিকায়ন, সমরাস্ত্র ক্রয় এবং নতুন প্রযুক্তি সংযোজনের জন্য মোট বাজেটের মাত্র ২-৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
সমরাস্ত্র ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে দেশটি নৌবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করাসহ দেশের সমরাস্ত্র কারখানা শক্তিশালী করে আধুনিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা এবং সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তি আয়ত্তের চেষ্টা।
এই পরিকল্পনার মধ্যে কিছু চুক্তি ইতিমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং অন্যগুলো এখনো আলোচনা বা প্রাথমিক চুক্তি (LOI) পর্যায়ে রয়েছে। সর্বপ্রথম, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ইতালির শীর্ষ প্রতিরক্ষা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান Leonardo S.p.A-এর সঙ্গে একটি Letter of Intent (LOI) স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে উগ্র আধুনিক Eurofighter Typhoon মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান কেনার প্রাথমিক পর্যায়ের চুক্তি ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকায় বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইতালি থেকে এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহের ব্যাপারে আলোচনা শুরু করার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই Typhoon কেনার উদ্যোগকে BAF-এর জন্য একটি নির্ধারক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে যদি এটি চূড়ান্ত হয়। পাশাপাশি, ইতালি ও তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধবিমান, আক্রমণ শক্তিশালী বিমান, অ্যাটাক হেলিকপটার ক্রয় এবং বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য আলোচনা চলছে। যেমন-২০২৭সালের মধ্যে ইতালি থেকে ১০টি ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান এবং তুরস্ক থেকে ছয়টি T-129 অ্যাটাক হেলিকপটার সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত আলোচনার জন্য একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সরকার তুরস্কের সঙ্গে ড্রোন ও সমরাস্ত্র উৎপাদনের সম্ভাবনাও যাচাই করছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুর্কি প্রযুক্তিভিত্তিক এটাক ড্রোন নির্মাণ এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বাংলাদেশে উৎপাদনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে নির্দিষ্টভাবে আধুনিক যুদ্ধবিমান বা সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের কোনো চূড়ান্ত চুক্তি এখনো স্বাক্ষরিত না হলেও, আগের সময়ে পাকিস্তান থেকে JF-17 Block 3 যুদ্ধবিমান ক্রয় নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ এবং আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, লালমনিরহাট এলাকায় একটি সামরিক বিমানবন্দর বা বেস উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামরিক ও কৌশলগত পরিকল্পনায় এই বেসটি বিমান বাহিনীর আঞ্চলিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, বিশেষত যদি ইউরোফাইটার বা অন্যান্য শক্তিশালী বিমান এখানে স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবে আসে।
ওপরের সব উদ্যোগ, প্রাথমিক চুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে দেখা যায় যে, অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক ও মাল্টি-ডোমেইন সক্ষম বাহিনীতে রূপান্তর করতে ব্যাপকভাবে মনোনিবেশ করছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী শক্তিশালী ও প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম করতে চীন থেকেও আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ এবং দেশের ভেতরে সামরিক প্রযুক্তি ও ড্রোন নির্মাণ সক্ষমতা গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ হলো চীন থেকে আধুনিক J-10 (J-10CE) মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের পরিকল্পনা। বাংলাদেশ সরকার প্রায় ২০টি J-10CE যুদ্ধবিমানের জন্য প্রাথমিকভাবে ২.২ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি পরিকল্পনা করেছে। এই বিমানগুলো ৪.৫ জেনারেশনের ক্ষমতার এবং ASEA রাডার, উন্নত সেন্সর ও অত্যাধুনিক মিসাইল ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা রাখে, যা বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ও বহুমাত্রিক বিমান অপারেশন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করবে। চুক্তিটি সরকারি (এ২এ) ভিত্তিতে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে এবং অর্থ প্রদানের অনের মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার ফলে পাইলট প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও লজিস্টিকসহ পূর্ণ প্যাকেজটি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও চীনা প্রতিরক্ষা শিল্পের যৌথ উদ্যোগে দেশীয় ড্রোন বা UAV উৎপাদন কারখানার সিদ্ধান্তেও অগ্রগতি হয়েছে। চুক্তি বা প্রযুক্তি স্থানান্তর সম্পর্কিত প্রস্তাব অনুসারে, বাংলাদেশে একটি ড্রোন নির্মাণ প্ল্যান্ট প্রতিষ্ঠার কাজ শিগগিরই সম্পন্ন হওয়ার আশা করা হচ্ছে। এতে দেশের ভেতরেই আধুনিক নজরদারি ও আক্রমণাত্মক ড্রোন তৈরির সক্ষমতা গড়ে উঠবে। একই সহযোগিতায় চীন একটি বিমান ও সরঞ্জাম মেরামত সুবিধা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে সামরিক বিমান ও যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভিসিং সহজ হয়।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সমমানের দেশগুলোর তুলনায় সামরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে। পাকিস্তান, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া এবং মিশরের মতো দেশগুলোতে সামরিক ব্যয় এবং আধুনিকায়নে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়ন শুধু অস্ত্র সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এয়ারপোর্ট, নৌবাহিনী ঘাঁটি, রাডার ও নজরদারি সিস্টেম এবং সামরিক কারখানার উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি দেশে কয়েকটি সামরিক বিমানঘাঁটি আধুনিকীকরণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে বিমানবন্দর, রাডার সিস্টেম ও জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে সমরাস্ত্র উৎপাদন এবং লজিস্টিক সাপোর্ট সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই আধুনিকায়ন কার্যক্রমের ফলে বাংলাদেশের সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হবে। সামরিক বাজেট পুনর্বিন্যাস এবং সংস্থান বাড়ানো হলে দেশটি উচ্চমানের অস্ত্র সংগ্রহ, রাডার ও নজরদারি সিস্টেম স্থাপন এবং দীর্ঘপাল্লার মিসাইল ও ড্রোন প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে। দেশীয় উৎপাদিত সমরাস্ত্রের মাধ্যমে আমদানি কমানো, রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব।
বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি বিনিময়ও বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শুধু অস্ত্র ও প্রযুক্তি নয়, মানবসম্পদ এবং নৈতিক মানের উন্নয়নও অপরিহার্য। বিগত সময়ে সামরিক বাহিনীর নৈতিক মান কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল, যা সম্প্রতি পুনঃ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দক্ষ প্রশিক্ষণ, নৈতিক মান, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং নেতৃত্বের বিকাশের মাধ্যমে দেশের সামরিক বাহিনী কার্যকর ও আত্মনির্ভরশীল হবে।
বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা। আঞ্চলিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা জোট এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে সামরিক সক্ষমতা অর্জনের পথ সুগম হবে। নৌবাহিনী, আকাশ প্রতিরক্ষা, স্থল বাহিনী, সমরাস্ত্র শিল্প, ড্রোন প্রযুক্তি, রাডার ও নজরদারি সিস্টেম এবং সামরিক এয়ারপোর্ট নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব।
সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশীয় উৎপাদন। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, দীর্ঘপাল্লার ট্যাংক এবং আধুনিক এয়ারক্রাফ্ট তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে দেশীয় শিল্পকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিতভাবে সামরিক বাজেটের একটি অংশ সমরাস্ত্র ও আধুনিকায়নে বরাদ্দ করলে, নৈতিক মান এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন ঘটালে, দেশের ভেতরে সমরাস্ত্র ও সামরিক এয়ারপোর্ট তৈরি করলে এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় অংশ নিলে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা দক্ষিণ এশিয়ার সমমানের দেশগুলোর সঙ্গে তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এটি কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা প্রভাব বিস্তারে কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান স্থাপন করবে।
বিগত দশকগুলোর ব্যর্থতা এবং সীমিত বাজেটের কারণে দেশের সামরিক সক্ষমতা পিছিয়ে থাকলেও, বর্তমান সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দেশীয় উৎপাদন এবং নৈতিক মান উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আগামী প্রজন্মে আঞ্চলিক শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল দেশ হিসেবে অবস্থান গড়ে তুলতে পারবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

