হাদি হত্যাকাণ্ড: গুজব ও নাশকতা 

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:২৩

বাংলাদেশ গণতন্ত্রের এক ঐতিহাসিক ও জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা-পরবর্তী নির্বাচনি আমেজ, অন্যদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির নৃশংস হত্যাকাণ্ড সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে এক গভীর অস্থিরতার ছায়া ফেলার অপচেষ্টা চলছে। 

বিশেষ করে ঢাকা-৮ আসনের শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হাদির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা যখন অনেকের মাথাব্যথা, ঠিক তখনই ১২ ডিসেম্বর পল্টনে হাদিকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলি ছিল কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়, বরং নির্বাচনি পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার এক সুগভীর চক্রান্ত।

হাদি হত্যার পর যেভাবে গুজব ছড়িয়ে জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদহানি ঘটানো হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে একটি অশুভ চক্র জল ঘোলা করে নির্বাচন বানচালের পাঁয়তারা করছে। অতীতে আমরা দেখেছি, কীভাবে জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি করা হয়েছে; আজ সেই একই অপশক্তি হাদি হত্যার আবেগকে পুঁজি করে রাষ্ট্রকে অকার্যকর করতে চাইছে। এই ধরনের নাশকতা কেবল জানমালের ক্ষতি করে না, বরং এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা।

একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য যখন স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন, তখন হাদি হত্যার মতো ঘটনা এবং পরবর্তী সহিংসতা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এই সংকটের মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দীর্ঘদিনের দলীয়করণ, চরম অপেশাদারিত্ব এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী পরিস্থিতিতে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে একধরনের ভঙ্গুর অবস্থা আমরা লক্ষ করছি। মাঠ পর্যায়ে পুলিশের এই কাঠামোগত দুর্বলতা এবং মনোবলের অভাবের কারণে বর্তমানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনি পরিবেশ শান্ত রাখতে সেনাবাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও ভীতিমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের যে সুদৃঢ় আস্থা রয়েছে, তা এই ক্রান্তিকালে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান অবলম্বন। সেনাবাহিনী কেবল একটি সামরিক শক্তি নয়, বরং চরম বিশৃঙ্খলার সময়ে তারা জাতির অভিভাবক হিসেবে আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এই প্রতিক‚লতার মধ্যেও হাদি হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর তৎপরতা আমাদের নতুন করে আশান্বিত করছে। যেখানে অতীতে এ ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার এক ঘৃণ্য সংস্কৃতি ছিল, সেখানে বর্তমান প্রশাসন ও ডিএমপি কমিশনার সরাসরি রাজপথে এসে ঘোষণা দিচ্ছেন যে, আগামী ৭ জানুয়ারির মধ্যেই চার্জশিট দাখিল করা হবে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ২১৮ কোটি টাকার সই করা চেক এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তল উদ্ধার করে ষড়যন্ত্রের মূল উপড়ে ফেলার কাজ করছে। 

অথচ অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বড় বড় গণমাধ্যম যখন সংস্থাগুলোর পূর্বের নেতিবাচক কাজ নিয়ে প্রত্যক্ষ সমালোচনা বা সত্য-মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে, তখনো সংস্থাগুলো রাষ্ট্রীয় বৃহত্তর স্বার্থে নীরব থেকে পেশাদারিত্ব ও ধৈর্যের চরম পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ভিউ ব্যবসায়ী’রা যখন সংস্থাগুলোকে নিয়ে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করছে, তখনো তারা বিভ্রান্ত না হয়ে মূল অপরাধীদের শনাক্তে কাজ করে যাচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এখনো কিছু লোক দেশে কোনো বড় ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটলে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-কে ঢালাওভাবে টেনে নিয়ে আসে। এই অবিশ্বাসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আমাদের জানা। বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার তার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে এই সংস্থার কিছু কর্মকর্তাকে ব্যবহার করার যে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেই জনমনে একধরনের নেতিবাচক ধারণা প্রোথিত হয়েছিল। 

কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লব কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, এটি ছিল প্রতিষ্ঠানের আমূল পরিবর্তনের ম্যান্ডেট। ৫ আগস্টের পর ডিজিএফআইসহ প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থা এখন আর আগের মতো নেই। বর্তমানে এই সংস্থাগুলো সরাসরি বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের স্বীকৃত কণ্ঠস্বর, নোবেল শান্তি পুরস্কারবিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দক্ষ নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। বিগত ১৭ মাসে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম বা রাজনৈতিক অনধিকার চর্চার একটিও অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলেও ওঠেনি। এটি একটি উদীয়মান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি গৌরবের।

সময় এসেছে পরিবর্তনের এই পতাকাকে সমুন্নত রাখার এবং সত্যকে স্বীকার করার। আমাদের প্রথাগত ও সামাজিক গণমাধ্যমগুলোর কোনোটিই গত দেড় বছরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যে গঠনমূলক বিবর্তন হয়েছে, তার যথাযথ মূল্যায়ন বা স্বীকৃতি দিচ্ছে না। সত্য প্রকাশের মাধ্যমে যার যা প্রাপ্য, তা প্রদান করা এখন নাগরিক ও নৈতিক দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করতে হলে আমাদের গুজববিমুখ হতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক এই সংস্কারের মর্যাদা দিতে হবে। 

হাদির রক্ত যেন কোনোভাবেই নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের খোরাক না হয়; বরং সেই বিচারের পথেই আমাদের সত্যনিষ্ঠ ও সংস্কারমুখী হয়ে এগিয়ে যেতে হবে। 

একটি সুষ্ঠু নির্বাচন এবং স্থিতিশীল বাংলাদেশের জন্য সেনাবাহিনী, আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থা ও সচেতন জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা এখন সময়ের দাবি। সত্যের জয় অনিবার্য।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক  

ইত্তেফাক/এমএএম