জীবনসংগ্রামীদের জন্য আইন ও সহমর্মিতা প্রসঙ্গ

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৩০

ডিসেম্বরের সেম্বরের ৩ তারিখে অনেকটা নীরবেই চলে গিছে ইন্টারন্যাশনাল ডে অব পারসন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটি। বিশ্বব্যাপী দিবসটি ফলাও করে পালিত হলেও বাংলাদেশে নানা রাজনৈতিক কারণে প্রায় আড়ালেই ছিল। দুর্ভাগ্যজনকই বটে। শারীরিক ও মানসিক ত্রুটির কারণে জীবনের স্বাভাবিক গতি যাদের বাধাগ্রস্ত তাদের বলা হয় প্রতিবন্ধী। অন্যভাবে বলা যায়, স্বাভাবিক কাজকর্ম বা চিন্তা করতে যাদের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তারা প্রতিবন্ধী। আরো একটু পরিষ্কার করে বলতে গেলে বয়স, লিঙ্গ, জাতি, সংস্কৃতি বা সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী সাধারণ মানুষ যে কাজগুলো করতে পারে প্রতিবন্ধিতার কারণে সে কাজগুলো প্রাত্যহিক জীবনে করতে না পারাটাই হলো প্রতিবন্ধিতা বা (disability)। ধরন অনুযায়ী মানুষের মধ্যে প্রায় ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতা শনাক্ত হয়েছে। এগুলো হলো, অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারস, শারীরিক, মানসিক অসুস্থতাজনিত, দৃষ্টি, বাষ্প্রতিবন্ধীতা, বুদ্ধি এবং শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, বহুমাত্রিক এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা।

সিএসআইডি (Centre for Services and Information on Disability) পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৪০ দশমিক ৯৫ ভাগ নারী ও কিশোরী প্রতিবন্ধিতার শিকার হয় জন্মগত কারণে, ৩ দশমিক ৩২ ভাগ শিকার হয় ভুল ও অপচিকিৎসার কারণে। এছাড়া বিভিন্ন অসুখ, জ্বর, দুর্ঘটনায় ইত্যাদি কারণে ৫৫ দশমিক ৭৪ ভাগ।

স্বাধীনতার ৪১ বছর অতিক্রান্ত হলেও মোট জনসংখ্যার এক-দশমাংশ প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক তেমন কোনো কার্যকরি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ দেশের প্রতিবন্ধীরা বরং অসহায়। আর দশ জন স্বাভাবিক মানুষের মতো তাদের সামাজিক সব অধিকার ভোগ করার কথা থাকলেও তারা বরাবরই উপেক্ষিত থাকে। আত্মীয়স্বজন সামাজিক মানমর্যাদার ভয়ে তাদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়। এমনকি অনেক পরিবারেও তাদের স্বাভাবিক মর্যাদা দেওয়া হয় না। শিক্ষা, চাকরি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, বিয়ে, প্রজনন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণে তারা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারে না।

নানাবিধ কারণে আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবস্থার দৃশ্যত তেমন কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম-সুযোগ, সম-অংশগ্রহণ, সম-অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রতিবন্ধীদের আমানত গ্রহণ, ঋণ প্রদান ও ব্যাংক হিসাব খুলতে সহযোগিতা করাসহ সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা দিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া আছে। জাতীয় বাজেটে প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রতি বছর অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও প্রতিবন্ধীদের

ভাগ্য পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে না।

প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। বিশ্ববাসীর চোখের সামনে স্টিফেন হকিং, হেলেন কেলারসহ শত শত কৃতী মানুষের উদাহরণ জ্বলজ্বল করে আলো ছড়াচ্ছে। সঠিক কার্যকর শিক্ষা ও যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূ পান্তরিত করা সম্ভব। এজন্য একদিকে দরকার শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ ও লাগসই প্রযুক্তির সহায়তা, অন্যদিকে প্রয়োজন প্রতিবন্ধীদের জন্য কর্ম সহায়ক পরিবেশ। মূলত এই কাজটি করার জন্য ১৯৯২ সাল থেকে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে প্রতি বছরের ৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস পালন করা হয়।

২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসের প্রতিপাদ্য বা স্লোগান ছিল: 'Fostering disability-inclusive societies for advancing social progress', যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় 'প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ি, সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করি'। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সুরক্ষা, তাদের কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ 'প্রতিবন্ধী অধিকার সনদ' অনুমোদন করে। এই সনদের আলোকে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩' প্রণয়ন করে।

এই আইনের ৩১ (১) ধারা অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিবন্ধন এবং পরিচয়পত্র প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এখনো পর্যন্ত দেশের সব প্রতিবন্ধী মানুষকে নিবন্ধনের আওতায় আনা যায়নি। এজন্য বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ন্যাশনাল সার্ভে অন পারসনস উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ, ২০২২ হিসেবে, বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী জনসংখ্যা হচ্ছে ৪৬ লাখ। আবার জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী এই সংখ্যা ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৬০৪ জন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা হচ্ছে ৩৬ লাখ ৫১ হাজার ৬৭৬ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে পৃথিবীতে মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগ প্রতিবন্ধী। সেই হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখ। যদিও বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীদের নতুন তালিকা করতে জরিপ কাজ শুরু করেছে। তথ্যগত বিভ্রান্তির অবসান করা আশু প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার নিবন্ধিত প্রতিবন্ধীদের ভাতা প্রদানের শুরু করে ২০০৫-০৬ সালে। আগে এই ভাতার পরিমাণ ছিল মাসিক ৬০০ টাকা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভাতার পরিমাণ মাসে ৭৫০ টাকা করা হয়। জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ নিতান্তই নগণ্য। আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মশক্তিতে রূপান্তর করা। অন্তত যারা পুরোপুরি সামর্থ্যহীন তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে আনা হোক। পুনর্বাসনে পেশাজীবীদের সাহায্য ও সহযোগিতাই পারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়ন করতে। সরকারের একক চেষ্টায় পরিবর্তন আসা কঠিন। এক্ষেত্রে বেসরকারি অংশীজনদের এগিয়ে আসতে হবে। প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে ও প্রতিবন্ধীবান্ধব করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পিছিয়ে আছেন, নাকি আমরাই তাদের পিছিয়ে রাখছি, সেটাও ভাবতে হবে। বাংলাদেশে এ ব্যাপারে একটি আইন আছে। কোনো কোম্পানি যদি তাদের মোট কর্মকর্তার ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষকে চাকরি দেয়, তাহলে বার্ষিক করের ৫ শতাংশ ফেরত পাবে। কিন্তু এটা আসলে হচ্ছে না। এ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের আরো অনেক মেধাবী প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়ে কাজের সুযোগ পাবে।

উপযুক্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং কর্মক্ষেত্রে সংহত হওয়া প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক অধিকার। শুধু চাকরি প্রদান করাই যথেষ্ট নয়: কর্মস্থানে তাদের ধরে রাখতে হলে সেগুলোকে তাদের নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী অভিযোজিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে উন্নতির যথেষ্ট সুযোগ এখনো রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য চাকরি প্রদানকে বোঝা হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং তাদের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিতভাবে এসব বিধানের স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষার জন্য অনেক চমৎকার নীতি রয়েছে। এখন কাজ হলো এসব নীতির বাস্তবায়ন। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উভয়ের মধ্যে দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়বদ্ধতা ছাড়া সবচেয়ে ভালো নীতিও সফল হতে পারে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ইস্যুগুলো মূলধারার মনোযোগ পায় না। প্রতিবন্ধীদের জন্য অনেক চমৎকার উদ্যোগ রয়েছে, যা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে না।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে অবশ্যই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়েই এগোতে হবে। পুনর্বাসনের পর তাদের কাজের ব্যবস্থা না করা হলে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। পুনর্বাসনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের স্বনির্ভর করা। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি পড়াশোনা করলেন, পুনর্বাসিত হলেন, দক্ষতা অর্জন করলেন, কিন্তু তিনি যদি কর্মক্ষম না হন, তাহলে প্রকৃত অর্থে তিনি পুনর্বাসিত হন না। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের চাহিদা বিবেচনায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ একান্ত প্রয়োজন। পুনর্বাসনের পেছনে কাজ করেন রিহ্যাবিলিটেশন পেশাজীবীরা। কিন্তু এখনো সরকারি খাতে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়নি। কেবল কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই মানুষগুলোকে পুনর্বাসন করে, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। সরকারি খাতে হেলথ টিম, রিহ্যাবিলিটেশন টিমের সঙ্গে থেরাপিস্টদের যদি সংযুক্ত করা হয়-ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্টসহ তাদের সমমর্যাদা দেওয়া হয়, তাহলে প্রতিবন্ধীরা পুনর্বাসিত হয়ে একটা পর্যায়ে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হতে পারবেন।

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক; বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এমএএম