১৯৭৯ সালে ইরানের শেষ শাহ, মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনের পূর্বে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করিয়া তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের প্রশাসন তাহার শাসনের বেশ কিছু বিষয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু করে। শাহের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা সাভাক (SAVAK) কর্তৃক রাজনৈতিক বন্দিদের উপর অমানবিক নির্যাতন এবং নির্বিচারে হত্যার কঠোর সমালোচনা করা হয়। সেই সময় শাহের হাতে ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রিকতা এবং দেশটিতে কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ থাকিতে না দেওয়া, শাহ ও তাহার পরিবারের বিলাসিতা এবং তৈলের টাকার অসম বণ্টন লইয়া পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলি সরব ছিল। শাহের দ্রুত আধুনিকায়ন বা ‘শ্বেত বিপ্লব’ (White Revolution) ইরানি সমাজের রক্ষণশীল অংশকে ক্ষুব্ধ করিয়াছিল, যাহা পশ্চিমা লিবারেল সমাজও দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করিত।
এখন আমরা দেখিব ২০২৬ সালে আসিয়া বর্তমান ইরান সরকারের প্রতি পশ্চিমা বিশ্ব কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিতেছে। অতি সম্প্রতি ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়, যদিও বহু বৎসর ধরিয়া পশ্চিমা নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হইয়াছে বলিয়া আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন। তবে ইহাতে ইরানের সর্বত্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়াইয়া পড়ে। ২০২৫ সালে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্ব নূতন করিয়া অভিযোগ করিতে শুরু করে যে, ইরান গোপনে আবারও পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করিতেছে। এই বৎসরের শুরু হইতেই ইরানে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর বলপ্রয়োগ এবং ফাঁসি কার্যকরের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ‘খুনি শাসন’ হিসাবে অভিহিত করে। ইহার পূর্বে ২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরাইল-ইরান সরাসরি যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, ইরান যদি আবারও পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করে, তাহা হইলে দেশটিকে মানচিত্র হইতে মুছিয়া ফেলা হইবে। সেই সময় তিনি হুমকি দিয়া বলেন যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা কোনো বিষয় নহে। তিনি ‘আমেরিকার জন্য একেবারেই সহজ লক্ষ্য’। আর কিছুদিন পূর্বে ইরান সরকারকে হুঁশিয়ার করিয়া তিনি বলিয়াছেন, ‘বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালাইবেন না, যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।’
বর্তমানে ইরানের সাবেক শাসক মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত রেজা পাহলভিকে ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের পরবর্তী শাসক হিসাবে ঘোষণা করেন নাই বটে, তবে সম্প্রতি তিনি এক সাক্ষাৎকারে তাহাকে 'ভালো মানুষ' বলিয়া অভিহিতি করিয়াছেন। উল্লেখ্য, ইরানের ১৯৭৯ সালের শাহের পতন এবং ইসলামি বিপ্লব দেশটির ইতিহাসে এক মোড়বদলকারী ঘটনা। ইহা ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা ইহাতে প্রায় আড়াই হাজার বৎসর ক্ষমতায় থাকার পর ইরানের রাজবংশের পতন ঘটে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। শাহ বংশের সর্বশেষ শাসক ছিলেন সেই মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। তিনি তাহার ২২তম জন্মদিনের পূর্বেই ১৯৪১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সিংহাসনে বসেন। পুত্র হিসাবে পিতার সংস্কার নীতি অব্যাহত রাখেন তিনি: কিন্তু বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে ধীরে ধীরে জনসমর্থন হারান। ১৯৪৯ সালে তাহাকে হত্যার একটি পরিকল্পনা ব্যর্থ হইয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর ইরানের ভূখণ্ডে প্রচুর তৈলসম্পদ আবিষ্কার হয়। অধিকাংশ তৈলের খনির মালিকানা ছিল ব্রিটিশ কোম্পানির হাতে: কিন্তু এই সকল তৈল বিক্রির টাকার কোনো উপকারিতা পাইতেন না ইরানের সাধারণ নাগরিকরা। এই সময় রাজনৈতিক নেতা হিসাবে আবির্ভাব ঘটে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের। তিনি তৈলসম্পদ জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দিয়া পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি অ্যাংলো-ইরানিয়ান তৈল কোম্পানিটি জাতীয়করণ করিলে ক্ষিপ্ত হয় ব্রিটেন। ইহাতে দ্বিতীয় দফা অভ্যুত্থানে ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হন। অভিযোগ রহিয়াছে, এই অভ্যুত্থানের পশ্চাতে কলকাঠি নাড়িয়াছিল মার্কিন ও ব্রিটিশ দুই গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ ও এম আই সিক্স।
মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ১৯৬৭ সালে নিজেকে ইরানের সম্রাট ঘোষণা করিলে এবং ১৯৭৬ সালে ইসলামিক ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে ‘ইমপেরিয়াল’ (সাম্রাজ্যিক) ক্যালেন্ডার চালু করিলে জনঅসন্তোষ ও ধর্মীয় বিরোধিতা বাড়িতে থাকে। ১৯৭৮ সালে ইরানে যখন চরম অস্থিরতা ও সহিংসতা শুরু হয়, তখন পশ্চিমা বিশ্ব বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানায়। সেই সময় উইলিয়াম সুলিভান তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি অবশ্য চেষ্টা করিয়াছিলেন খামেনির বাহিনীর সহিত শাহের বাহিনীকে যুক্ত করিতে; কিন্তু কোনো পক্ষই অপর পক্ষকে বিশ্বাস করিতে পারে নাই।
এখন ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও অস্থিরতা সেই ৪৬ বৎসর পূর্বের কাহিনি স্মরণ করাইয়া দিতেছে। শুধু পার্থক্য এই যে, পূর্বে সেই সময় সরকারে ছিলেন মোহাম্মদ রেজা পাহলভি, এখন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

