শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যায়-অনিয়ম কি চলিতেই থাকিবে?

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০০

সম্প্রতি ইত্তেফাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে। তাহাতে বলা হইয়াছে যে, গত এক বৎসরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অর্ধেকে নামিয়া আসিয়াছে। ইহার অর্থ কি এই নহে যে, দেশের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা অন্যায়, অবিচার, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে যতই সর্বস্বান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হউক না কেন, ইহাতে সরকারের করণীয় কিছুই নাই? অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি অধিদপ্তর গঠন করা হইয়াছে এই সকল দেখভালের জন্য। সংগত কারণে ৩৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতি ধরিবার কাজে তৈরি হইয়াছে স্থবিরতা।

খোদ সরকারি স্কুল-কলেজের অবস্থা আজ অনেকটাই সঙ্গিন। সেইখানে জনগণের করের টাকায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হইলেও অধিকাংশ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা তেমন একটা হয় না বলিলেই চলে। একদিকে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে শিক্ষার মানের অধোগতি ঘটিতেছে, অন্যদিকে বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলিতে শিক্ষাবাণিজ্য চরম আকার ধারণ করিয়াছে। কত কায়দায় যে অভিভাবকদের নিকট হইতে অর্থ আদায় করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের ওপর একপ্রকার মানসিক নির্যাতন করা হয়-শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান পরিস্থিতি লইয়া শ্বেতপত্র প্রকাশ করা গেলে তাহা দিবালোকের ন্যায় প্রতিভাত হইয়া উঠিত। বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলিতে লেখাপড়া অনেকটাই কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনি-নির্ভর হইয়া উঠিয়াছে। প্রাণবন্ত ক্লাসরুম তথা ক্লাসরুমেই অধিকাংশ লেখাপড়ার ব্যবস্থা তেমন নাই। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, শিক্ষার্থীরা ও জুলাই যোদ্ধারা আন্দোলন-সংগ্রাম করিয়া সরকার পরিবর্তন করিলেন বটে; কিন্তু খোদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হইতেই অন্যায়-অনিয়ম বন্ধ করিবার জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইল না। এমনকি শিক্ষা কমিশন গঠন করিবার প্রয়োজনীয়তাও আমরা উপলব্ধি করিতে পারিলাম না!

নির্মম বাস্তবতা এই যে, শিক্ষা প্রশাসনে ঘুষ-দুর্নীতির সিন্ডিকেট রহিয়াছে। এই যে, পাঠ্যপুস্তক বিতরণে প্রতি বৎসর কালক্ষেপণ চলিতেছে, তাহার পশ্চাতেও রহিয়াছে সিন্ডিকেট। ইহা ছাড়া থানা শিক্ষা অফিস হইতে শুরু করিয়া আঞ্চলিক শিক্ষা অফিস, শিক্ষা ভবন এমনকি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগে ঘুষের কথা বলাই বাহুল্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং এই সকল সংস্থাভুক্ত ১৩টি প্রতিষ্ঠানের সর্বত্র ঘুষ-বাণিজ্যে এই সিন্ডিকেটগুলি সক্রিয়। ইহারই প্রভাব পড়িতেছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের উপর যাহা তদন্ত করিতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা একান্ত আবশ্যক।

এমন প্রেক্ষাপটে সমগ্র দেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হাজার হাজার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম-দুর্নীতি, শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম ও জাল সনদ শনাক্তকরণ ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) যদি স্থবির হইয়া পড়ে বা তাহাদের কাজে অবহেলা ও শিথিলতা দেখা যায়, তাহা হইলে তাহা খুবই দুঃখ ও উদ্বেগজনক। ইহাতে দেশ কীভাবে সঠিক পথে চলিবে? কীভাবে মানুষ গড়ার কারিগররা ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্ব প্রদান করিবেন? অভিযোগ রহিয়াছে যে, ডিআইএর অধিকাংশ কর্মকর্তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে যান না। তাহা হইলে প্রশ্ন উঠে, তাহারা আসলে কী করেন? মাঝেমধ্যে পরিদর্শনে গেলেও ঘুষ গ্রহণ করিয়া অনিয়ম নাই বলিয়া রিপোর্ট দেন একশ্রেণির কর্মকর্তা। অথচ দেশে বর্তমানে এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫ লক্ষ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রহিয়াছেন। এই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করিতে ১৯৮৬ সালে মরহুম প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় ডিআইএ। এখন জনবলঘাটতিসহ কোনো অভ্যন্তরীণ বা বিভাগীয় সমস্যা থাকিলে তাহার সমাধানপূর্বক এই প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা অবশ্যই বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। সুশিক্ষিত, দক্ষ ও সুনাগরিক জনগোষ্ঠী তৈরি না হইলে রাষ্ট্রীয় সংহতি, উন্নয়ন ও অগ্রগতি এবং জাতি গঠনসহ সকল কিছুই বাধাগ্রস্ত হইবে। অতএব, শিক্ষাব্যবস্থায় যে কোনো অন্যায়-অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন