আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য রাজ্যজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বাংলাভাষী মুসলমানদের একটি অংশকে ‘মিঁয়া’ পরিচয়ে উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অভিযোগ দায়ের এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘চাপ সৃষ্টি’ করার কথা তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন বলে জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচ ভেলে (ডিডব্লিউ)-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন—দলের কর্মীরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিপুলসংখ্যক মুসলমান নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করছেন এবং এটি তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ। তার ভাষ্য, এভাবে না করলে আসামে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের উপস্থিতি’ বোঝা যাবে না। তিনি বিষয়টিকে ‘অস্তিত্বের প্রশ্ন’ হিসেবেও তুলে ধরেন।
ডিডব্লিউ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, মুখ্যমন্ত্রী একাধিক ক্ষেত্রে কীভাবে এই চাপ প্রয়োগ করা হবে, তাও ব্যাখ্যা করেন। কর্মসংস্থান, ঠিকাদারি কাজ, প্রশাসনিক নোটিস ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া- সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তার বক্তব্য ঘিরে বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, এটি একটি সম্প্রদায়কে প্রশাসনিকভাবে কোণঠাসা করার আহ্বান।
২০১৬ সালে বিজেপি আসামে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নাগরিকত্ব, ভূমি ও পরিচয়ের প্রশ্ন রাজ্যের রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। বাংলাভাষী মুসলমানদের ঘিরে রাজনৈতিক বয়ানও ক্রমশ জোরালো হয়। ২০২১ সালে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই অবস্থান আরও দৃশ্যমান হয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত।
২৭ জানুয়ারি ডিব্রুগড়ে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন যে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (এসআর) প্রক্রিয়ায় দলীয় কর্মীরা অভিযোগ দায়ের করছেন। তার যুক্তি, এটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ।
এই বক্তব্যের পর রাজ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনিচ্ছুক হলেও ডিডব্লিউকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় কেউ কেউ জানান, সরকারবিরোধী অবস্থান নেওয়া এখন ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন।
গুয়াহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরীর মতে, একজন মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে। তিনি ইঙ্গিত দেন, বিষয়টি আদালতে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
আসাম বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি দিয়ে অভিযোগ করেছেন, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে, যা সাংবিধানিক ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে। তার দাবি, বহু মানুষ দীর্ঘদিন রাজ্যে বসবাস করলেও তাদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কংগ্রেস নেতা আমিনুল হক লস্কর মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, এবং এর কার্যক্রম নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য অবস্থান গণতান্ত্রিক কাঠামোর দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক।
সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক ভাষার মান এমন পর্যায়ে নেমেছে যা সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ক্ষতিকর। তাদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘মিঁয়া’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ বাংলাভাষী মুসলমান হলেও আসামের বর্তমান রাজনৈতিক ভাষ্যে এটি প্রায়ই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে শব্দটি এখন শুধু পরিচয় নয়, বরং রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
গত কয়েক বছরে আসামের বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত পদক্ষেপ রাজ্য রাজনীতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে বিষয়টি এখন রাজনৈতিক বিতর্ক ছাড়িয়ে সাংবিধানিক অধিকার, নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা এবং সামাজিক সহাবস্থানের প্রশ্নে বড় আলোচনায় রূপ নিয়েছে।
সরকারি পর্যায়ে এখনও এ বিষয়ে আদালতের কোনো নির্দেশ জারি হয়নি। তবে বিতর্ক থামেনি; বরং নির্বাচনের আগে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।

