রোজা থাকা অবস্থায় অনেকের হঠাৎ ডায়াবেটিস বেড়ে যায় অথবা কমে যায়। বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সেক্ষেত্রে অনেকে রোজা রেখে ডায়াবেটিস মাপতে চান না। তাই ডায়াবেটিস বেড়ে গিয়ে বা কমে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। এজন্য ইফতারির আগে ও পরে অবশ্যই ডায়াবেটিস চেক করতে হবে। ইফতারি ও সেহরিতে সুষম খাবার রাখতে হবে। এ সময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সময়মতো ওষুধও গ্রহণ করতে হবে। রোজা রেখে যে ডায়াবেটিস পরিমাপ করা যায়, এ নিয়ে মসজিদে খুতবায় ইমাম সাহেবদের আরো বেশি করে আলোচনা করে, মানুষ সচেতন করতে হবে। তাহলে মানুষ রোজা ও চিকিৎসা একসঙ্গে চালিয়ে নিতে পারবে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দৈনিক ইত্তেফাকের মাজেদা বেগম মিলনায়তনে আয়োজিত ‘ডায়াবেটিস রোগীদের নিরাপদে রোজা পালনে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগিতায় আলোচনাসভাটি আয়োজন করে বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি (বিইএস) ও দৈনিক ইত্তেফাক। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান প্রতিবেদক শামছুদ্দীন আহমেদ।
রমজানে রোজা পালনের আগে ডায়াবেটিস রোগীদের ঝুঁকি শ্রেণিবিন্যাস করার সর্বোত্তম ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সভাপতি এবং বারডেম এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারিয়া আফসানা বলেন, রমজান একটা আত্মশুদ্ধির মাস, এ মাসে সবাই চান ডায়াবেটিস নিয়ে ও সুস্থভাবে রোজা রাখতে। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী-রোজার আগেই কার কতটুকু ডায়াবেটিস আছে, সে ব্যাপারে জেনে নেওয়া জরুরি। যাদের গত তিন মাসের মধ্যে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়েছে কিংবা যারা হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের হার্টের সমস্যা, চোখে সমস্যা আছে, যারা গর্ভবতী, বাচ্চাকে ব্রেস্টফিড করাচ্ছেন এবং যারা টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের জন্য রোজা রাখা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ।
এ ধরনের রোগী রোজা রাখতে চাইলে ক্লোজ মনিটরের মাধ্যমে রোজা রাখতে পারেন। যারা দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং ইনসুলিন নিচ্ছেন, তারা মাঝারি ঝুঁকিতে আছেন। তারা গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে রোজা রাখতে পারেন। আর যাদের ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে, হয়তো ওষুধ খান, তারা চিকিৎসকের পরামর্শে রোজা রাখতে পারেন।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম সাইফুদ্দীন বলেন, ‘রোজা রাখার তিন মাস আগে ঝুঁকি নিরূপণ করতে হবে। চিকিৎসক রোগীর রোগের ইতিহাস জেনে তার বিএমআই দেখে, রোগীর কোমরবিডিটি আছে কিনা, তা জেনে কিছু পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর ঝুঁকি নিরূপণ করেন। এইচবিএ-১সি পরীক্ষা করে আমরা দেখি, তার গত তিন মাসে ডায়াবেটিস কেমন ছিল। তা জেনে রোগী যেন নিরাপদে রোজা রাখতে পারেন, সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকি।’
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, রোজার সময় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নতুন ওষুধ যোগ না করে পুরোনো ওষুধগুলো কমিয়ে কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সেটি খেয়াল রাখতে হয়। রোজার সময় ডায়াবেটিস রোগীরা নাশতার সময় যে ওষুধ গ্রহণ করেন. সেটি ইফতারের সময় গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া রাতের ওষুধগুলো সেহরির সময় গ্রহণ করতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীরা রোজার সময় ডায়াবেটিসের ওষুধের পাশাপাশি গ্যাসের ওষুধসহ অন্য ওষুধও খান, সেটিও ডায়াবেটিসের ওষুধের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। রোজায় ওষুধ খাওয়ার বিষয়ে আগে থেকে ভালোভাবে জানলে রোজা পালন করতে সুবিধা হয়।
ইউনাইটেড হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজির সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ডায়াবেটিসের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী ওষুধ হচ্ছে ইনসুলিন। রোজায় সাধারণত আমরা ইনসুলিন কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা তিন ধরনের ইনসুলিন ব্যবহার করি। সকালের ইনসুলিন ইফতারির সময় ও রাতের ইনসুলিন সেহরির সময় নিতে আমরা রোগীদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। রোজার সময় নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে, প্রয়োজনে যদি ডায়াবেটিস কমে যায় ও বেড়ে যায়, সেক্ষেত্রে রোজা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভাঙতে হবে।’
এন এইচ এন বাডাসের সহযোগী অধ্যাপক ও কনসালট্যান্ট ডা. নাজমুল কবির কুরেশী বলেন, রোজায় ডায়াবেটিস রোগীদের ইফতারির আগে হাইপোগ্লাইসোমিয়া হয়। তাই নিয়মিত ডায়াবেটিস পরিমাপ করতে হবে। এখন ডায়াবেটিস মেশিন অনেকটা সহজলভ্য। ইফতারির আগে ডায়াবেটিস রোগীদের রেস্টে থাকতে হবে, কোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রম করা যাবে না। ব্যায়াম থেকে এ সময় দূরে থাকতে হবে। ইফতারির সময় সঙ্গে সঙ্গে ইফতারি করে নিতে হবে। সেহেরি সময়মতো করতে হবে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজির বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মির্জা শরীফুজ্জামান বলেন, ‘রোজায় ডায়বেটিস রোগীরা ওষুধ ঠিকমতো না খাওয়ার কারণে হঠাৎ ডায়াবেটিস বেড়ে যায় অথবা কমে যায়। পরে আমাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসে। আমরা সাধারণ সময়ে ডায়াবেটিস খাবারের আগে ও খাবারের দুই ঘণ্টা পরে মাপি। কিন্তু রোজার সময় অবশ্যই ডায়বেটিস ইফতারির আগে ৪টা/৫টার দিকে মাপতে হবে। আবার ইফতারির পরও মাপতে হবে। তবে সবার জন্য দিনে চার-পাঁচ বার মাপা সম্ভব নয়, যারা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন তারা সেটি করতে পারেন। অনেকে মনে করেন ডায়াবেটিস মাপলে রোজার ক্ষতি হবে কি না। এখন পর্যন্ত বায়তুল মোকাররমের ইমামসহ আমাদের ধর্মীয়ভাবে এই ফতোয়া দেওয়া হয়েছে, রোজা রেখে ডায়াবেটিস মাপলে অথবা ইনসুলিন দিলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।’
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজির বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আফসার আহমেদ বলেন, ‘রোজায় ডায়াবেটিস রোগীদের অন্য সময় মতো খাবারের ক্যালোরি ইফতারি ও সেহরিতে সমন্বয় হচ্ছে কিনা, খেয়াল রাখতে হবে। এ সময় ডায়াবেটিস রোগীরা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকেন, যার কারণে ইফতারের সময় ভাজাপোড়া বাদ দিতে হবে এবং অতিরিক্ত পরিমাণ খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। অবৈজ্ঞানিক খাবার বাদ দিয়ে বৈজ্ঞানিক খাবার গ্রহণ করতে হবে।’
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি হেলথ সাইন্সের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার আহমেদ সালাম মীর বলেন, রমজানে ডায়াবেটিস রোগীদের হঠাৎ ডায়াবেটিস কমে গেলেও অনেকে সেটি বুঝতে পারে না। এ সময় রক্তে সোডিয়াম কমে যায় বা বেড়ে যায়। তাই যাদের উচ্চ ঝুঁকি নেই তাদের মিনিমাম সপ্তাহে দুই থেকে তিন বার অবশ্যই ডায়াবেটিস মাপতে হবে। এ সময় ডায়াবেটিস রোগীদের অবস্থা অনুযায়ী ওষুধ কমিয়ে দিতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের হাই ক্যালোরি ও হাই ফ্যাট জাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে। গর্ভকালে সুগার বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, তাই বারবার টেস্ট করতে হবে এবং বাচ্চার বৃদ্ধি ঠিক আছে কিনা, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজির সহযোগী অধ্যাপক ডা. মারুফা মোস্তারী বলেন, আমরা রোগীর কাছে থেকে জানতে চাইব, তারা সব রোজা ঠিকমতো করতে পেরেছেন কিনা, তাদের রোজা ভেঙে ফেলতে হয়েছে কিনা, রোজা রেখে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল কিনা, যেমন হাইপোগ্লাইসেমিয়া, এ অবস্থা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল কিনা, ক্রিয়েটিনের মাত্রার কোনো ধরনের পরিবর্তন হয়েছিল কিনা, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের ওষুধের কোনো রকমের পরিবর্তন করতে হয়েছিল কিনা। এসব বিষয়ে বিশদ মূল্যায়নের পরে আমরা আবার তাদেরকে শ্রেণিবিন্যাস করতে পারি যে, যারা নিরাপদে রোজা রাখতে পেরেছেন, তারা কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং যারা পারেননি, তারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এভাবে একটা বিশ্লেষণ করতে পারি যে, ডায়াবেটিস রোগীরা কীভাবে বর্তমানের ওপর ভিত্তি করে নিরাপদে রোজা রাখতে পারবেন।
বিকন ফার্মাসিটিক্যালসের ক্রনিক কেয়ার ডিভিশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মো. ফয়সাল হাবীব বলেন, ‘ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ রাখতে বিকন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনেই আমাদের ওষুধগুলো তৈরি হয়ে থাকে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধগুলো বাজারে কোনো সংকট তৈরি হচ্ছে কিনা, তা জানার জন্য সার্বক্ষণিক বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা রাখি আমরা। রমজান মাসে যেসব ওষুধ নিরাপদ, তা তৃণমূল থেকে শুরু করে সারা দেশে সরবরাহ করে থাকি। অতীতেও আমরা এই সহযোগিতা দিয়ে এসেছি, ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
