মাহমুদুর রহমান মানিক
জনশক্তি রপ্তানিতে পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কর্মীরা নিয়োজিত আছে পৃথিবীজুড়ে। সবচেয়ে বেশি আছে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ। এছাড়া আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, রাশিয়া, জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশে প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি অভিবাসী বিভিন্ন কাজ ও ব্যবসায়ে নিয়োজিত আছে। আর তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স তৈরি পোশাকের পরে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাত। এ খাত থেকে প্রতিবছরে অর্জিত হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৫০০ কোটি মার্কিন ডলার এবং গত এক দশকে রেমিট্যান্স হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হয়েছে প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকা। পরিবার-পরিজন ও দেশের মায়া ত্যাগ করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশের কয়েক লাখ মানুষ বিদেশে পাড়ি জমায়। বর্তমানে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছে। দেশে বেকারত্বের হার কমছে এবং অর্জিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। দূর বিদেশে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা যে রেমিট্যান্স পাঠায় সেই টাকায় আমরা দেশে বসে উন্নয়নের নানা ছক কষি কিন্তু খুব কম সময়ই ভাবি বিদেশ থেকে যারা দেশের উন্নয়নে এত বড়ো ভূমিকা রাখছে তারা কতটুকু দক্ষ।
বিদেশে কর্মরত শ্রমিক ভাইয়েরা যদি ভালো না থাকে, দেশ ও দেশের অর্থনীতিও ভালো থাকবে না কারণ আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে যাবে। ভিন দেশে গিয়ে তারা খুব একটা ভালো থাকতেও পারে না। তার অন্যতম একটি কারণ হলো বর্তমান পুঁজিবাদী ও কর্মমুখী শ্রমবাজার চায় দক্ষ শ্রমিক কিন্তু আমাদের দেশ থেকে যারা যাচ্ছে তাদের বেশিরভাগই অদক্ষ। আমাদের দেশ থেকে প্রেরিত প্রায় ৫০ ভাগ শ্রমিকই অদক্ষ, ২০ ভাগ সেমি-দক্ষ, ২৭ ভাগ দক্ষ এবং মাত্র ২ থেকে ৩ ভাগ প্রফেশনাল শ্রমিক। আবার আমরা যাদের দক্ষ বলি তাদের মাত্র এক মাসের একটি ট্রেনিং দিয়েই দক্ষর সার্টিফিকেট দেই কিন্তু প্রফেশনালিজম চিন্তা করলে তারাও অদক্ষ বা সেমি-দক্ষ। ফলে বাংলাদেশের শ্রমিকদের সাধারণত নিম্ন স্তরে ও অল্প বেতনে কাজ করতে হয়, এজন্য আয়ও কম হয়। বেশিরভাগ শ্রমিক দেশে কৃষিকাজ করে আর বিদেশ গিয়ে ভবন ও সড়ক নির্মাণ, ইলেকট্রিশিয়ান, তৈরি পোশাক, গৃহকর্মী ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত হয় এবং দক্ষতার অভাবে কঠোর পরিশ্রম করেও প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়।
ফিলিপাইন আমাদের চেয়ে কম সংখ্যক শ্রমিক প্রেরণ করে প্রায় দ্বিগুণ রেমিট্যান্স অর্জন করে। এ থেকে স্পষ্ট অনুধাবন করা যায় দক্ষতার অভাবে আমাদের শ্রমবাজার মার খাচ্ছে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও তা বিদেশে প্রেরণ করতে পারলে রেমিট্যান্স অর্জন কয়েক গুন বেড়ে যাবে যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শুধু সংখ্যায় না বাড়িয়ে উপযুক্ত ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে কর্ম ও ভাষা দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ পাঠাতে হবে।
এখনো অধিকাংশ মানুষ বিদেশে কাজ করতে যায় কোনো দক্ষতা ছাড়া দালালের মাধ্যমে, এজন্য অনেক সময় তারা প্রতারিত হয় কিন্তু যখন বুঝতে পারে তখন আর কিছুই করার থাকে না। ভিটেবাড়ি বন্ধক রেখে বিদেশে গিয়ে যখন প্রতারিত হয় এবং দক্ষতার অভাবে অধিক পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত অর্থ না পায় তখন চারদিক থেকে হতাশ হয়ে পড়ে ও অনেকে স্ট্রোকও করে। ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার অভিবাসীর লাশ দেশে এসেছে। এদের মধ্যে প্রায় ১৩ হাজারই স্ট্রোকজনিত কারণে মারা গেছে। এতেই বোঝা যায় ভিনদেশে কতটা মানসিক প্রেসারে ভোগে আমাদের শ্রমিক ভাইয়েরা। আমাদের শ্রমিকরা যে দেশে যায় সে দেশের কৃষ্টি-কালচার এবং ভাষা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নিয়ে যায় না। ফলে শুরুর দিকে নিত্যদিনের কাজ চালিয়ে নিতে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। ইদানীংকালে নারী কর্মীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। অধিকাংশ নারী কর্মী পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে গৃহকর্মী হিসেবে দূর বিদেশে পাড়ি জমায় কিন্তু সেখানে গিয়েও যেন মুক্তি নেই। কাজ ও ভাষার দক্ষতা না থাকায় অধিক পরিশ্রমের পাশাপাশি মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের স্বীকার হয়। নির্যাতনের পরেও দেশে আসতে পারে না, যারা চলে আসে তাদের অনেকের মুখেও শোনা যায় শারীরিক নির্যাতনের ভয়াবহ কাহিনি।
এত কিছুর পরেও যারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে এবং দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তারাই তো আমাদের সূর্যসন্তান, দেশ গড়ার অন্যতম কারিগর, এখন সময় এসেছে তাদের উন্নয়নে কিছু করার, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার। দেশ থেকে যদি দক্ষ মানবসম্পদ বিদেশে পাঠানো যায় তাহলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পাশাপাশি তারাও হয়রানি ও অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে মুক্তি পাবে। আমাদের দেশে মাত্র ৬০ থেকে ৭০টি মানব সম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে যা মোটেই পর্যাপ্ত নয়। দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও এখাতে বিনিয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে প্রণোদনা দিতে হবে। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রশিক্ষণ নিয়ে গেলে আমাদের দেশের শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও বেতন পাবে এবং আমাদের শ্রমবাজার আরো সমৃদ্ধ হবে, দেশ অর্জন করবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
