শফিকুর রহমান রয়েল
প্রয়োজন প্রচলিত নিয়ম মানে না। প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী অথচ আর্থিক সংস্থান নেই, তখনই মানুষ আবিষ্কার করে ফেলে কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো অতি সস্তার জিনিস। এই সস্তারই জয়জয়কার চলছে সারা দুনিয়ায়। সেই উপলব্ধি থেকেই প্রাথমিক ধারণাটা তারা গ্রহণ করেছিল পায়ে চালানো যান রিকশা থেকে। সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়েছে চার চাকার গাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে। পুরনো গাড়ির ইঞ্জিন কিনে ভারতের রাজস্থানের কৃষকরা তৈরি করে ফেলেছে নতুন গাড়ি, যার নাম দিয়েছে ‘যুগাড়’। নতুন এই যানে যাত্রীর পাশাপাশি মালামাল বহনেরও ব্যবস্থা আছে। নতুন প্রবর্তনমূলক এরকম আরো অনেক কিছু বানাচ্ছে ভারত। আসলে অর্থের পাশাপাশি সম্পদও যেখানে কম, সেখানে উদ্ভাবনী দক্ষতা যে আবশ্যক হয়ে পড়ে, তার বড় প্রমাণ হচ্ছে এশিয়ার দুই বৃহত্ রাষ্ট্র ভারত ও চীন। বৈশ্বিক মন্দার এ সময়ে এই দুই দেশ তাদের বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা চালাচ্ছে সেসব স্থানে, যেখানে ভোক্তারা তাদের অর্থের অধিক মূল্য প্রত্যাশা করছে। অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের দুই সর্ববৃহত্ রাষ্ট্রের বিশেষত্ব এখানেই।
ভোক্তার আয় নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছুলেই কেবল কতিপয় জিনিষের কেনাবেচা শুরু হয়— এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন মূল্য কমিয়ে আনার প্রবর্তনকারীরা। ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজস্থ জাজ বিজনেস স্কুল ফর ইন্ডিয়া অ্যান্ড গ্লোবাল বিজনেস সেন্টার আয়োজিত কনফারেন্সে তাদের উপদেষ্টা রামা বিজাপুরকার বলেছিলেন, ‘সীমিত পরিসরে শুধু ধনীদের কাছে জিনিষ বিক্রি না করে পুনঃউদ্ভাবনের মাধ্যমে উত্পাদিত সামগ্রী সবার জন্য প্রস্তুত করে তোলাটা অনেক বেশি লাভজনক এই কৌশল যারা গ্রহণ করবে, কেবল তারাই ভবিষ্যতে বাজারে টিকে থাকতে পারবে’। দাম দিয়ে জিনিষের গুণ বিচারের দিন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। প্রয়োজন মেটানোর দিকটা সারা বিশ্বেই এখন মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকন্তু অর্থ খরচ যদি কম হয়, তাহলে তো কথাই নেই।
ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনিল গুপ্ত ‘হানি বি’ নামক একটি নেটওয়ার্ক সংগঠন পরিচালনা করেন। তার এই সংগঠন তৃণমূল পর্যায়ে নতুন কিছুর উদ্ভাবনকে উত্সাহিত করে এবং এর পরিচালনের ব্যাপারে সহযোগিতা জোগায়। কয়েক বছরে আগে তাদের প্রকল্পে নতুন এক রেফ্রিজারেটর যুক্ত হয়ে বলতে গেলে বিস্মিত করে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে। মাটি দিয়ে তৈরি এই রেফ্রিজারেটরের জন্য বিদ্যুতের কোনো প্রয়োজনই নেই। শাক-সব্জি সজীব থাকে কয়েক দিন পর্যন্ত। মোটরসাইকেলের ওপর ফসল মাড়াইয়ের যন্ত্র স্থাপনেরও বিশাল কৃতিত্ব দেখিয়েছেন ভারতের কৃষকরা। এখানেই শেষ নয়, তৈরি করার প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে জটিল বিষয়াদিতেও অনেক কিছুর প্রবর্তন ঘটছে। রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আর অ্যান্ড ডি) ল্যাবরেটরি যে হারে বাড়ছে, তার সঙ্গে মিল রেখে গবেষণার খরচ বাড়াচ্ছে ভারত ও চীন। অর্থনীতির আকারের ক্ষেত্রে জাপানকে পেছনে ফেলেই ক্ষান্ত হয়নি চীন, গবেষণার পেছনে খরচের বেলাতেও জাপানকে অতিক্রম করার কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে চীন। ৩০০’রও বেশি বহুজাতিক কোম্পানি ইতিমধ্যে চীন আর অ্যান্ড ডি সেন্টার চালু করেছে— এ কথা জানিয়েছেন জাজ স্কুলের খণ্ডকালীন অধ্যাপক পিটার উইলিয়ামসন। চীনা বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা সেখানে কাজ করছে। ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের তুলনায় তাদেরকে বেতনও দিতে হয় এক-তৃতীয়াংশ। মূল লক্ষ্য উত্পাদিত দ্রব্যকে স্থানীয় বাজারের সঙ্গে মানানসই করা। কিন্তু এখন তারা বিশ্ববাজারের জন্যও উত্পাদনকে উন্নীত করছে।
এখন পর্যন্ত অবশ্য ক্ষুদ্র স্তরেই নবপ্রবর্তন বেশি ঘটছে। বিওয়াইডি নামক চীনা ইলেকট্রনিক্স ফার্ম লিথিয়াম আইঅ্যান ব্যাটারিকে উন্নীত করে সস্তা ও সহজ করে তুলেছে। ৪০ মার্কিন ডলারের ব্যাটারি এখন তারা বিক্রি করছে মাত্র ১২ ডলারে। এমন উদাহারণ আছে অসংখ্য। জেপিএমসি নামের প্রতিষ্ঠানটি ৮০০ কর্মীকে নিয়োগ দিয়েছিল কন্টেইনার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরির জন্য। কয়েক বছর পর তারা এখন হার্বার ক্রেইনের বিশ্ববাজারের অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করছে। জংজিং মেডিক্যাল নামক প্রতিষ্ঠান এরাস্পেস শিল্প থেকে প্রযুক্তি ধার করে নিয়ে প্রস্তুত করে ফেলেছে এক অত্যাধুনিক এক্স-রে মেশিন, যা কি না সরাসরি ডিজিটাল ইমেজ নিতে সক্ষম। জিই ও ফিলিপসের তৈরি বিশেষায়িত এক্স-রে মেশিনের তুলনায় জংজিংয়ের মেশিনের মূল্য এক-দশমাংশ। অবশ্য জিই ও ফিলিপস তাদেরকে দেখে শেষমেশ দাম কমাতে বাধ্য হয়।
ভারতের উর্বর ও তুলনামূলকভাবে কম মূল্যের সিনেমা শিল্প বছরে তৈরি করছে ১২ হাজারেরও বেশি সিনেমা। তারাও এখন বৈশ্বিক হচ্ছে। ভারতীয় ছবির প্রচুর বিদেশি দর্শক থাকার কারণে হলিউডের সঙ্গে আরো অনেক বেশি যৌথ প্রযোজনার দাবি রাখে। রিলায়েন্স এন্টাটেইনমেন্ট ২০০৮ সাল থেকে আমেরিকান প্রোডাকশান হাউজগুলোর সঙ্গে চুক্তির সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। প্রযোজক রোহান সিপ্পি একবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘হলিউডের স্টুডিওগুলো ভারতীয় ছবি নির্মাতাদের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য মুখিয়ে আছে’। ভারতীয়রা তৈরি করার আগেই আমেরিকান মুভির নাচ-গানের ‘মসলানির্ভর’ সংস্করণ তারা তৈরি করতে চায়। হলিউডের ছবি পুরোপুরিভাবে বলিউডে তৈরি হওয়ার দিনও হয়তো ঘনিয়ে আসছে। মূল ব্যাপার হচ্ছে খরচ, আর কম খরচে ভালো ছবি তৈরিতে বলিউডের বিকল্প নেই। মূল্য কমিয়ে আনার ব্যাপারে সবচেয়ে বড় চমকটি দেখিয়েছিল ভারতের শীর্ষ গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান টাটা মোটর্স। ২০০৯ সালে মার্চ মাসে মাত্র ১ লাখ রুপির (২১০০ মার্কিন ডলার) ন্যানো গাড়ির প্রবর্তন ঘটিয়ে চমকে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে। তখন গাড়িশিল্পের কিছু রথী-মহারথী উচ্চারণ করেছিলেন, ‘কয়েক বছর পর ইউরোপ আমেরিকার রাস্তা ছেয়ে যাবে ন্যানোতে।’ এই ভবিষ্যদ্বাণী না মিললেও কম আয়ের লোকদেরকে অন্তত নিজ মালিকানাধীন গাড়িতে চড়ার স্বপ্ন তো দেখাতে পারছে তারা।
