ব্যতিক্রমী শহিদ দিবস উদযাপন

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:১০

গতকাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমগ্র দেশে পালিত হইল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও জাতীয় শহিদ দিবস। এই বারের এই দিবসটি পালনের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটিয়াছে। প্রথমত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে ফুল দিয়া ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাইয়াছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ইহাই প্রথম বারের মতো কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জামায়াত আমিরের পুষ্পস্তবক অর্পণ। ইহা লইয়া এখনো আলোচনা-সমালোচনা চলিতেছে। প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি শহিদ মিনারে যান। এই সময় তাহার সহিত এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে তিনি সেইখানে মোনাজাত পরিচালনা করেন। শহিদ মিনারে এমন ঘটনাও বিরল। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন যে, বিরোধীদলীয় নেতা ও রাষ্ট্রীয় আচার হিসাবে ইহা তাহার দায়িত্ব। ইহা কতটা জায়েজ বা নাজায়েজ এই প্রশ্ন এমন পবিত্র দিনে অবান্তর। ইহার পর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার হইতে জামায়াত নেতা যান আজিমপুর কবরস্থানে এবং ভাষা শহিদদের কবর জিয়ারত করেন ও শহিদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করিয়া দোয়া করেন। তিনি ১৯৪৭ সাল হইতে শুরু করিয়া ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত যাহারা মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করিয়া প্রাণ দিয়াছেন, তাহাদের সকলের জন্য মোনাজাত করেন।

এই ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শহিদ মিনারে যাওয়ায় বিশ্বাস না করিলেও এখন সেখানে যাওয়া শুরু করিয়াছে এবং ইহার মাধ্যমে তাহারা নিজেদের ‘রিব্র্যান্ডিং’ বা নূতনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করিতেছে। ইহার পাশাপাশি বলেন যে, তিনি সর্বত্র পরিবর্তনের চিত্র দেখিতে পাইতেছেন। দ্বিতীয়ত এই বার শহিদ মিনারের বেদি প্রাঙ্গণ সাজানো হইয়াছে ভিন্ন আঙ্গিকে। সকল মিলাইয়া বলা যায়, এই বার একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের মাধ্যমে জামায়াত বাস্তবতাকে ক্রমান্বয়ে মানিয়া লইবার জন্য প্রস্তুতি লইতেছে। তাহারা পূর্বে কেন শহিদ মিনারে যাইতেন না? তাহাদের দৃষ্টিতে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে পুষ্পস্তবক দেওয়ায় কোনো উপকার নাই। বরং ইসলামের বিধান অনুযায়ী কোনো মুসলিম মারা গেলে আমাদের কর্তব্য হইল তাহার জন্য দোয়া করা, তাহাদের পক্ষ হইতে গরিব-অসহায় মানুষকে দান-সাদকাহ করা, জনকল্যাণমূলক কাজ করা, সাদকায়ে জারিয়ামূলক কাজকর্ম করা, তাহাদের উদ্দেশে হজ-উমরা করা ইত্যাদি। ইহার বদলে তাহাদের স্মৃতি রক্ষায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, তাহাতে পুষ্পার্ঘ্য দেওয়া, মোমবাতি জ্বালানো, এক মিনিট নীরবতা পালন প্রভৃতি অমুসলিম সংস্কৃতির অংশ। অর্থাৎ শহিদ মিনার কেন্দ্রিক আচার-আচরণে এত দিনের ধর্মনিরপেক্ষ যে দৃষ্টিভঙ্গি এই বার তাহার ব্যত্যয় হইয়াছে। অবশ্য অনেকে মনে করেন খোদ 'শহিদ মিনার' কথাটিতেই একটি বিশেষ ধর্মের বিশ্বাস নিহিত রহিয়াছে। এমনকি শহিদ মিনারের সরকারি মূল ডিজাইনে এইখানে একটি মসজিদ নির্মাণের যে কথা বলা হইয়াছে তাহা আজ পর্যন্ত কেন বাস্তবায়িত হয় নাই, সেই প্রশ্নও অনেকে করিয়া থাকেন।

উল্লেখ্য, এই শতাব্দীর শুরুতে প্রয়াত জামায়াত আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে একদা জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল তাহার সরকার প্রতিষ্ঠিত হইলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার কী হইবে? তাহাদের কি জিজিয়া কর দিতে হইবে? জ্ঞানী ও বিচক্ষণ এই নেতা কিছুক্ষণ চুপ থাকিয়া জওয়াব দিয়াছিলেন যে, বাংলাদেশ তো ইসলামি রাষ্ট্র হয় নাই। সেই দিন তিনি যে উত্তর দিয়াছিলেন, আজিকার বাস্তবতায় একই কথা কি প্রযোজ্য নহে? 

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন