প্রত্যেক মানুষের নিকট তাহার মাতৃভাষা সবচাইতে সুমধুর। পৃথিবীতে মোট ভাষার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজারের কাছাকাছি; কিন্তু ইহার মধ্যে প্রায় ৩ হাজারের মতো ভাষা পৃথিবী হইতে বিলুপ্ত হইয়া যাইবে মাত্র ১০০ বত্সরের মধ্যে। ইতিপূর্বে এমন আশঙ্কার কথাই জানাইয়াছেন বিশ্বের ভাষাতত্ত্ববিদরা। ভাষাভাষীর সংখ্যার দিক হইতে বাংলা ভাষা অবশ্য পৃথিবীর পঞ্চম স্থান অধিকারী মাতৃভাষা। তবে একটি জরিপে বলা হইয়াছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে চাইনিজ, স্প্যানিশ ও ইংরেজি হইবে সবচাইতে প্রভাবশালী ভাষা। যদিও অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি যত দিন যাইবে ততই বিকশিত হইবে, একটি ভাষা হইতে অন্য ভাষায় রূপান্তরের বিষয়টিও ততই সহজ ও গ্রহণযোগ্য হইয়া উঠিবে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে আমূল বদলাইয়া দিতেছে। ভাষার ক্ষেত্রেও ইহার প্রভাব বিপুল ও বিস্ময়কর ঘটিবে বটে। তবে মাতৃভাষা চিরকালই যে কোনো জনগোষ্ঠীর সবচাইতে স্পর্শকাতর বিষয়। মা, মাটি কিংবা মাতৃভাষার উপর আঘাত কোনো জাতিই সহজে মানিয়া লইতে পারে না। এই জন্য দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তি করিয়া সদ্যস্বাধীন পাকিস্তানের উপর প্রথম আঘাত করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী জনগণ। আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রুদ্ধ করিবার ঘটনাটি ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ‘নিজপায়ে’ প্রথম কুঠারাঘাত। এমনকি তাহারা চাহিয়াছিল বাংলা বর্ণমালার পরিবর্তে রোমান বা আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রবর্তন করিতে।
বাংলা এখন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা। পৃথিবীর প্রায় ৩৩ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। ইহার মধ্যে বাংলাদেশে ১৭ কোটি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে ১৩ কোটি এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে আরো প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। সবচাইতে আনন্দের কথা হইল, ২০১০ সালে ইউনেসকোর একদল ভাষাবিজ্ঞানীর দীর্ঘ গবেষণার পর পৃথিবীর সবচাইতে শ্রুতিমধুর ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পাইয়াছে বাংলা ভাষা। সেই তালিকায় দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে রহিয়াছে যথাক্রমে স্প্যানিশ ও ডাচ ভাষা। অথচ এই অপূর্ব শ্রুতিমধুর ভাষাকেই কিনা গলা টিপিয়া ধরিয়াছিল পাকিস্তানি দুঃশাসকেরা। সত্যিকার অর্থে ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষাকে রক্ষার আন্দোলনই শেষাবধি বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়, ১৯৭১ সালে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। কোনো ভাষাকে রক্ষার জন্য বাংলা এখন একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত, একুশে ফেব্রুয়ারি হইয়াছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
আমাদের সবচাইতে বড় স্বস্তি এইখানে যে, নূতন প্রজন্মের মধ্যে এখনো প্রতি বৎসর একুশ আসে নূতন এক শিহরনে। এই শিহরন যেন প্রজন্ম হইতে প্রজন্ম বহিয়া বেড়াইতেছে, ইহা যেন কখনো পুরাতন হইবার নহে। কোনো ভাষার ফ্রেমে যেন যথার্থভাবে আটকানো যায় না কিংবা প্রকাশ করা যায় না ইহার অভাবিত নবতর অনুভবকে। কী বিস্ময়! বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষ একুশের ভিতর হইতে তাহার শৈশব-কৈশোর-যৌবন পার করিয়া বাঙালি-বাংলা ভাষা আর বাংলাদেশকে ভালোবাসার এক অপূর্ব দিনটির মাধ্যমে। এই কারণে একুশ এখনো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকে রুখিবার সবচাইতে বড় প্রতিষেধক। এই জন্য একুশ এক অহর্নিশ অনির্বাণ শিখা—যাহার কারণে মসিকৃষ্ণ অমানিশাতেও পথভ্রষ্ট হয় না বাংলাদেশ। বাংলাকে ভালোবেসেই এই প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে আমাদের বিশ্ব নাগরিকের যোগ্যতা অর্জন করিতে হইবে। শিখিতে হইবে ইংরেজিসহ আরো যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভাষা।
একুশ এখন মহিরুহ। ইহা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে, একুশ প্রতি বৎসর টপকাইয়া যাইতেছে নিজের উচ্চতাকে। একুশে আমাদের ঐক্যবদ্ধই শুধু করে নাই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হইতেও শিখাইয়াছে। একুশের আর একটি বড় শিক্ষা হইল, জনগণের আন্দোলন ও আত্মত্যাগ কখনোই বিফলে যায় না। আমাদের এই গৌরব যাহারা দান করিয়াছেন, যাহারা অন্তরে লালন করিয়াছেন, নেপথ্যে ভূমিকা রাখিয়াছেন, একুশে ফেব্রুয়ারির আজকের দিনে তাহাদের জন্য রহিল অশেষ ভালোবাসা। বাংলা তো কেবল ভাষা নহে, বাংলা একটা দেশ, একটা সুমধুর স্বপ্নের নাম।

