শব্দদূষণ আর নয়

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ২১:৩০

আলী আকবর

নানামুখী দূষণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ঢাকা শহর বসবাসের জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। শুধু ঢাকা নয় জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে এখন যে সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করেছে তাহলো- শব্দদূষণ। নানা ধরনের শব্দে অতিষ্ঠ নগরবাসী। বাসার বাইরে পা দিলেই বিকট শব্দে মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যানবাহনের হর্ন ও হাইড্রোলিক হর্ন নগরবাসীর জন্য আরেক বিরক্তির কারণ। অতি শব্দে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী আজ কোমলমতি শিশুরা।

তাই স্কুল-কলেজের আশপাশে হর্ন না বাজানোর বিধান থাকা জরুরি। ইদানীং শহরে যে শ্রবণ প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বাড়ছে এজন্য ভয়াবহ শব্দদূষণকে অনায়াসে দায়ী করা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্য মতে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবল। পরিবেশ অধিদপ্তরের গত বছরের জরিপে দেখা যায় দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মানমাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে। যা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে আড়াই থেকে তিনগুণ বেশি। এছাড়াও বিভিন্ন জরিপে আমরা লক্ষ্য করেছি, ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় চলে গেছে। ঢাকার এ অধঃপতনের জন্য শব্দদূষণও দায়ী। বিভিন্ন ধরনের শব্দে মানুষ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতোমধ্যে দেশের প্রায় ১২% মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে আসে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগসহ, ফুসফুসজনিত জটিলতা, মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্মরণশক্তি হ্রাস, মানসিক চাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা। এটা খুবই দৃষ্টিকটু যে, হাইকোর্টের নির্দেশনা সত্ত্বেও যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ হয়নি। এখনো উচ্চশব্দের এ হর্ন বাজিয়ে রাজধানীতে ছুটছে যানবাহন। এর বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান ও মামলা হলেও রোধ করা সম্ভব হয়নি।

প্রকাশ যে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গেল ছয় মাসে ট্রাফিক পুলিশ ১৮ হাজার ৫২২ হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছে, আর এ সময়ে মামলা হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৩৩৮। আমরা মনে করি, বিষয়টি নিয়ে সরকার অত্যন্ত সচেতন এবং শব্দদূষণ প্রতিরোধে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে; তবে বাস্তবতা হলো আশানুরূপ ফল পাওয়া গেছে, তা দাবি করা যাবে না।

পরিতাপের আরেকটি বিষয় হলো, এতদসত্ত্বেও হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, হাইড্রোলিক হর্ন হচ্ছে উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী বিশেষ হর্ন। আমেরিকান স্পিচ অ্যান্ড হেয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (আশা) ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মানুষের জন্য শ্রবণযোগ্য শব্দের সহনীয় মাত্রা সর্বোচ্চ ৪০ ডেসিবেল। কিন্তু হাইড্রোলিক হর্ন শব্দ ছড়ায় ১২০ ডেসিবেল পর্যন্ত। এর স্থিতি ৯ সেকেন্ডের বেশি হলে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। দেশের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুসারে রাজধানীর আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় দূষণের সর্বোচ্চ মাত্রা ৬০ ডেসিবেল। এর থেকে উচ্চমাত্রার শব্দে শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হূদরোগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, বিরক্তি সৃষ্টি ও শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। সহজেই অনুমান করা যায়, ভয়াবহ এক পরিস্থিতির মধ্যে রাজধানীবাসীর বসবাস। এবং তা এখন জাতীয় সমস্যা সারা দেশেই দেখা দিয়েছে।

তথ্য মতে, হাইড্রোলিক হর্ন নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমের মধ্যেও ঢাকাসহ সারাদেশে এখনো এই হর্ন বিক্রি হচ্ছে। এটা অনতিবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি। এ নিয়ে গাড়ির মালিক এবং চালককে অবশ্যই সচেতন হতে হবে, আর যত্রতত্র হর্ন বাজানোর অভ্যাস বাদ দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালের আশপাশেও হর্ন বাজানো পুরোপুরি বন্ধ করা প্রয়োজন। শব্দের মানমাত্রা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শহর বাসযোগ্য করতে চাইলে অবশ্যই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। আর সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের জন্য তা একান্ত কাম্য।

n লেখক :শিক্ষার্থী, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ,

ফরিদপুর