মিথ্যা ও পাইকারি মামলা প্রত্যাহার করা হউক

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:১৬

গত ৫ আগস্টের পর দায়ের করা যেই সকল মামলায় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজের গণ্যমান্য ও পরিচিত ব্যক্তিদের আসামি করা হইয়াছে এবং তাহারা হয়রানির শিকার হইতেছেন বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে, সেই সকল মামলা পর্যালোচনা করিয়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়াছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গত সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সকল দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সহিত এক বৈঠকে তিনি এই নির্দেশনা দেন। ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী পরিস্থিতির সুযোগ লইয়া কিছু সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী অনেক মানুষকে হয়রানি করিবার উদ্দেশ্যে আসামি করিয়া এই সকল মামলা দায়ের করিয়াছে, যেইখানে তাহাদের জড়িত থাকিবার কোনো প্রশ্নই আসে না। তাহারা মিথ্যাভাবে ফাঁসিয়া গিয়াছেন এবং এই জন্য তাহারা অত্যন্ত মনঃকষ্টে জীবন যাপন করিতেছেন। ইহার কারণে অনেকের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন নরকময় হইয়া উঠিয়াছে। তাহাদের আত্মীয়স্বজনও কোর্ট-কাচারি করিতে করিতে হয়রান ও পেরেশান। তাই আমরা আশা করি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন শীঘ্রই তাহার নিকট জমা দেওয়া হইবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের সহিত যুক্ত ৮৩৭টি হত্যা মামলাসহ সমগ্র দেশে ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা দায়ের করা হইয়াছে। সংস্থাটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই ‘পাইকারি হারে মামলা দায়ের' লইয়া গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে। তাহাদের হিসাবমতে, সমগ্র দেশে প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষকে আসামি করা হইয়াছে। এই সকল মামলার অধিকাংশই হত্যা মামলা এবং নির্দিষ্ট কয়েক জনের নাম উল্লেখ করিয়া অধিকাংশ আসামির নাম উল্লেখ করা হইয়াছে অজ্ঞাত হিসাবে। এমনকি যিনি বা যাহারা এই সকল মামলা দায়ের করিয়াছেন, তাহারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসামিদের চেনেন না। আবার আসামি বা বাদীরা চেনেন না বিবাদীদের। তাহাদের ঠিকানাও ভিন্ন, এমনকি দূরদূরান্তের। টাকাপয়সা দিলে মামলা হইতে নাম কর্তনের ব্যবস্থা করা হইয়াছে, না দিলে অব্যাহত ছিল হুমকি-ধামকি। ইহা লইয়া রীতিমতো মামলা-বাণিজ্য করা হইয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাপের মুখে সঠিক তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণ করিয়াছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও স্বীকার করিয়াছিল যে, এই সকল অধিকাংশ মামলা টিকিবে না। সরকার ডিসিদের নিকট এই ব্যাপারে আবেদন জানাইবার আহ্বান জানায় এবং সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত সাপেক্ষে তাহাদের নাম প্রত্যাহারের ব্যাপারে আশ্বাস দেওয়া হয়; কিন্তু সেই আশ্বাস অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা লওয়া হয় নাই।

হয়রানি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক এই সকল মামলা দায়েরের কারণে এই দেশের জনমনে তো বটে, আন্তর্জাতিক মহলেও নানা প্রশ্নের উদ্রেক করিয়াছে। মানবাধিকারের দিক হইতে ইহা খুবই দুঃখজনক। এইরূপ ঢালাও মামলা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধক। যাহারা জুলাই গণহত্যা বা খুনখারাবির সহিত জড়িত, তাহাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হউক, ইহাই সকলের কাম্য; কিন্তু যেই সমস্ত নিরপরাধ ব্যক্তি পাইকারিভাবে মামলা দায়েরের কারণে হয়রানির শিকার হইতেছেন, তাহাদের এই সকল অন্যায্য, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হইতে অবশ্যই রেহাই দিতে হইবে। যে কোনো মামলা স্পেসেফিক বা সুনির্দিষ্ট হওয়াই বাঞ্ছনীয়। হত্যাকাণ্ডের মামলা হইলে কে, কোথায়, কীভাবে ও কেন মার্ডার করিয়াছেন, তাহার সকল কিছু সুস্পষ্ট করিয়া নথিতে উল্লেখ করা প্রয়োজন; কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ডে ১০০ হইতে ১৫০ জনের নাম উল্লেখ কি হাস্যকর ও অগ্রহণযোগ্য নহে? অনেক সময় রাজনীতিবিদদের হেয় করিবার জন্য তথা তাহাদের মানসম্মান ধুলায় লুটাইয়া চরিত্র হরণের জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে এমন মামলা দায়েরের বহু নজির রহিয়াছে। এই অপসংস্কৃতি চলিয়া আসিতেছে প্রাগৈতিহাসিক আমল হইতে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করিতে হইলে এই রূপ জঘন্য মনমানসিকতা হইতে আমাদের বাহির হইয়া আসা প্ৰয়োজন।

অতএব, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের পর দেশে যেই সকল ঢালাও, গায়েবি, মিথ্যা ও সাজানো মামলা দায়ের করা হইয়াছে তাহা পর্যালোচনাপূর্বক অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হউক। একজন নিরীহ মানুষও যেন মিথ্যা মামলার কারণে অবিচারের শিকার না হন, সেই দিকে নূতন সরকারের দৃষ্টি
দেওয়া প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/এনএন