কার্গো হাউস চালুর দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই, খোলা আকাশের নিচে শত শত টন আমদানি পণ্য!

  • শাহজালালে কার্গো সংকট চরমে, প্রতিদিন জমছে হাজার টন পণ্য
  • রানওয়ে ছুঁইছুঁই আমদানি পণ্য, বাড়ছে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা
আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:২৮

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর–এর আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পরিবেশগত ঝুঁকি ও অপারেশনাল জটিলতার কারণে চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্থায়ী আমদানি কার্গো টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হওয়ার চার মাস পরও পূর্ণাঙ্গ কার্গো হাউস চালুর দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না থাকায় প্রতিদিন শত শত টন পণ্য খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকছে। এতে বাড়ছে জট, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা।

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড গত ২২ ফেব্রুয়ারি সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বর্তমান সংকটের চিত্র তুলে ধরে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ১৮ অক্টোবর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার বর্গফুট আয়তনের স্থায়ী আমদানি কার্গো টার্মিনাল (বিসিটি) সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ মেট্রিক টন পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা একযোগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানি কার্যক্রমে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়।

অগ্নিকাণ্ডের পর অস্থায়ীভাবে গেট নং-০৯ দিয়ে ডেলিভারি শুরু হলেও পর্যাপ্ত গুদাম সুবিধা না থাকায় বিপুল পরিমাণ পণ্য বিমান ইঞ্জিনিয়ারিং হ্যাঙ্গার সংলগ্ন উন্মুক্ত স্থানে রাখতে হচ্ছে। এতে পণ্যের মানহানি, আবহাওয়াজনিত ক্ষতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণে বেড়েছে। পরে গেট নং-০৮/এ চালু করে যানবাহন চলাচলে কিছুটা ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হলেও মূল সংকট কাটেনি।

সম্প্রতি ভাড়া-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অস্থায়ী তাঁবু অপসারণ করা হয়েছে। ফলে সীমিত ধারণক্ষমতার গুদামেই পণ্য রাখতে হচ্ছে। অতিরিক্ত পণ্য গুদামের বাইরে স্তূপাকারে জমে রানওয়ের কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এতে মূল্যবান আমদানি পণ্য অনিরাপদ অবস্থায় পড়ে থেকে বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে এবং ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় আমদানি করা কাঁচামাল দ্রুত খালাসের অনুরোধ জানিয়ে সদস্য কারখানাগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

দীর্ঘ সংস্কারের পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আমদানি কার্গো কমপ্লেক্স এলাকায় আংশিক কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এর আয়তন মাত্র ৪০ হাজার বর্গফুট। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১,২০০ মেট্রিক টন পণ্য আসায় বড় অংশই জমে থাকছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রেকর্ড অনুযায়ী ১,২৭৮ মেট্রিক টন কার্গো ডেলিভারির অপেক্ষায় ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানিনির্ভর শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বর্তমান ব্যবস্থায় অপারেশনাল ঝুঁকিও বেড়েছে। ব্রেকডাউন এলাকার প্রবেশপথ ও ড্রাইভওয়ে সংকীর্ণ হওয়ায় ট্রাক প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় একাধিকবার ব্যাকিং করতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ও সময়ক্ষেপণ—দুটিই বাড়ছে। আনলোডিং, ব্রেকডাউন ও লোডিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত ম্যানুভারিং স্পেস না থাকায় ফর্কলিফট ও ট্রলি চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্যাটাগরিভিত্তিক স্টোরেজ তিনটি পৃথক স্থানে থাকায় একটি কনসাইনমেন্ট ডেলিভারিতে একাধিক গেট ও রুট অতিক্রম করতে হচ্ছে, ফলে ব্যয় ও সময়—উভয়ই বাড়ছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, অগ্নিকাণ্ডের পর পুড়ে যাওয়া রাসায়নিক বর্জ্য ও ধুলাবালি যথাযথভাবে অপসারণ করা হয়নি। এতে শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় এ পরিবেশে কাজ করায় শ্বাসযন্ত্র ও ত্বকজনিত সমস্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংবেদনশীল ও ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্যের গুণগতমানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে কর্তৃপক্ষ পোড়া বর্জ্য অপসারণ, নিয়মিত ধুলা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ মনিটরিং চালুর নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট হ্যান্ডলিং ও ম্যানুভারিং জোন চিহ্নিত করে অপারেশনাল লে-আউট উন্নয়ন এবং স্টোরেজ ও ডেলিভারি জোন পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (অপারেশন) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, পুড়ে যাওয়া কার্গো হাউস আংশিকভাবে চালু হয়েছে। আশা করছি বর্ষার আগেই বাকি কাজ শেষ হবে। এছাড়া নবনির্মিত থার্ড টার্মিনাল চালু হলে সংকট অনেকটাই কাটবে। নতুন সরকারের ঘোষণার আলোকে সে অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্ষা শুরুর আগেই বিকল্প গুদাম সুবিধা, পরিবেশগত বর্জ্য অপসারণ এবং নিরাপদ অপারেশনাল অবকাঠামো নিশ্চিত না করলে দেশের আমদানি বাণিজ্য আরও বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

ইত্তেফাক/এএম