চিকিৎসার আশ্রয়স্থলেই অদৃশ্য বিপদের বীজ!

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৬:০০

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক মহৎ অর্জন হইল—মানুষের জীবনকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত হইতে ফিরাইয়া আনার সক্ষমতা। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা আইসিইউ সেই অর্জনের প্রতীক— যেইখানে চিকিৎসাপ্রযুক্তি, দক্ষতা ও সেবাশুশ্রূষা-ত্যাগ মিলিয়া জীবনরক্ষার এক নিবিড় ব্যবস্থা গড়িয়া উঠিয়াছে। কিন্তু কখনো কখনো এই জীবনরক্ষার আশ্রয়স্থলই যদি নূতন বিপদের উৎসে পরিণত হয়, তাহা হইলে তাহা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় আইসিইউতে ‘ক্যানডিডা অরিস' নামক ঔষধ-প্রতিরোধী ছত্রাকের বিস্তার সেইরূপ এক নীরব কিন্তু গুরুতর বিপদের ইঙ্গিত দিতেছে। আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত গবেষণায় দেখা গিয়াছে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের প্রায় সাত শতাংশের শরীরে এই ছত্রাকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছে। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হইল—তাহাদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রোগী আইসিইউতেই অবস্থানকালে সংক্রমিত হইয়াছেন। অর্থাৎ সংক্রমণের একটি বড় অংশ হাসপাতালের অভ্যন্তরেই ছড়াইতেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে তুলনা করিলে পরিস্থিতির গুরুত্ব আরো স্পষ্ট হয়। কানাডা বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উন্নত দেশে এই সংক্রমণের হার সাধারণত শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশেরও কম, অথচ ঢাকার হাসপাতালসমূহে তাহা বহু গুণ বেশি।

ক্যানডিডা অরিসকে বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থা ‘সুপারবাগ’ বলিয়া অভিহিত করে। কারণ, ইহা সাধারণত ব্যবহৃত অ্যান্টিফাংগাল ঔষধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলিয়াছে। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, প্রায় সব জীবাণুই ফ্লুকোনাজল ও ভরিকোনাজলের মতো প্রচলিত ঔষধে অকার্যকর। ফলে চিকিৎসা কঠিন হইয়া পড়ে এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য বিপদের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। যেই সকল রোগী দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকে, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন বা বিভিন্ন ক্যাথেটারের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করে—তাহাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বাড়িয়া যায়।

উন্নত বিশ্বে বহুদিন ধরিয়া হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ প্রতিরোধকে একটি স্বতন্ত্র জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু দেশে প্রতিটি বড় হাসপাতালে ‘ইনফেকশন কনট্রোল ইউনিট' কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়। রোগীর সংক্রমণ- ঝুঁকি নির্ণয়, নিয়মিত স্ক্রিনিং, কঠোর পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ—এই চারটি স্তম্ভের উপরই গড়িয়া উঠিয়াছে সেই ব্যবস্থা। বাংলাদেশেও অবশ্য সংক্রমণ প্রতিরোধের নিয়মাবলি আছে, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘাটতি প্রায়ই চোখে পড়ে। হাসপাতালের ভিড়, সীমিত অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং কখনো কখনো দায়িত্ববোধের অভাব—এই সকল কারণ মিলিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াইয়া তোলে। এখানে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, ক্যানডিডা অরিস কেবল একটি বিচ্ছিন্ন জীবাণু নয়—ইহা আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার সামনে উদ্ভূত বৃহত্তর সমস্যার প্রতীক। অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিফাংগাল ঔষধের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে বিশ্ব জুড়ে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স' ক্রমেই বড় সংকটে পরিণত হইতেছে। অনেক সময় রোগী কিংবা চিকিৎসক—উভয় পক্ষের অসতর্ক ব্যবহারে জীবাণুগুলি ক্রমশ শক্তিশালী হইয়া উঠিতেছে। আজ যাহা সহজে নিরাময়যোগ্য, কাল তাহাই দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হইতে পারে।

সুতরাং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথম প্রয়োজন সচেতনতা ও শৃঙ্খলা। ক্লোরিনভিত্তিক জীবাণুনাশক দ্বারা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের বাধ্যতামূলক হাত ধোয়ার সংস্কৃতি এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিয়মিত স্ক্রিনিং—এই তিনটি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দ্বিতীয়ত, অ্যান্টিফাংগাল ঔষধ ব্যবহারে সংযম ও যুক্তিসংগত নীতি প্রণয়ন জরুরি। উন্নত দেশগুলিতে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ প্রোগ্রাম' চালু আছে, যাহার মাধ্যমে ঔষধের ব্যবহার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। বাংলাদেশেও এই ধরনের কাঠামোগত ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। তৃতীয়ত, গবেষণা ও নজরদারি বিস্তৃত করা প্রয়োজন। ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালের গবেষণা আমাদের সমস্যার একটি অংশমাত্র দেখাইয়াছে। কিন্তু দেশের অন্যান্য হাসপাতালেও এই ছত্রাক কতখানি বিস্তার লাভ করিয়াছে, তাহা জানা এখন সময়ের দাবি। যথাযথ তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতিনির্ধারণ সম্ভব নয়।

বস্তুত, সুপারবাগের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল চিকিৎসকদের দায়িত্ব নহে—ইহা একটি সামষ্টিক দায়িত্ব। আমরা যত দ্রুত ইহার গুরুত্ব অনুধাবন করিব, ততই হাসপাতাল আবার নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হইবে। অন্যথায়, চিকিৎসার আশ্রয়স্থলেই অদৃশ্য বিপদের বীজ অঙ্কুরিত হইতে থাকিবে।

ইত্তেফাক/এনএন