‘পরিবহন খাতের অনিয়ম নিয়ে অভিযান হলেই যাত্রীরা জিম্মি হয়’

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৯, ২১:০৬

মোবাইল কোর্টের অভিযানের পরই চট্টগ্রাম

পরিবহন ধর্মঘটে যাত্রীদের ভোগান্তি

 মুহাম্মদ নিজামউদ্দিন, চট্টগ্রাম অফিস

পরিবহন সেক্টরে অনিয়ম বন্ধে প্রশাসন যখনই পদক্ষেপ নেয় তখনই মালিক-শ্রমিক ভেদাভেদ ভুলে রাস্তায় নামে। চট্টগ্রামে গত রবিবার বাড়তি ভাড়া আদায়ের কারণে কয়েকটি পরিবহন সংস্থাকে জরিমানা করে বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরপর হঠাত্ করে ধর্মঘট ডেকে পাঁচ ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে যাত্রীরা। পরে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

জানা যায়, বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত বাড়তি ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে বিআরটিসির মোড়ে হানিফ পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজারকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে। পরে অলংকার মোড় ভাটিয়ারী এলাকায় অভিযানে আরো দুটি পরিবহন সংস্থাকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এরপর সন্ধ্যায় হঠাত্ করে ঢাকা,  বেনাপোল ও চট্টগ্রামসহ ৬৮টি রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় তারা।

বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এস এম মনজুরুল হক ইত্তেফাককে বলেন, বাড়তি ভাড়া আদায়ে যাত্রীর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযুক্ত পরিবহন মালিককে জরিমানা করা হয়েছে। যাত্রীর টিকিট আমার কাছে রয়েছে। যখনই আমরা পরিবহন সেক্টরে অনিয়ম নিয়ে অভিযান করি তখনই পরিবহন সংশ্লিষ্টরা যাত্রীদের জিম্মি করে রাখে। যাতে তাদের অনিয়মের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে প্রশাসন বিরত থাকে। প্রতিবারই ঈদের আগে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ আসে। এবারও আমরা অভিযোগ পাচ্ছি। আমাদের অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।’ তবে বাস মালিকরা এটাকে বাড়তি ভাড়া আদায় বলতে নারাজ। তারা বলছেন ভাড়া সমন্বয় করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আন্তঃজেলা পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিলউদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা আগে যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম আদায় করেছি।

চট্টগ্রাম শহর থেকে যাত্রার সময় যাত্রী বেশি পাওয়া যায়। আর ফেরার সময় যাত্রী পাওয়া যায় না। ফলে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে ভাড়া সমন্বয় করা হচ্ছে। এটাকে বাড়তি ভাড়া আদায় বলা যাবে না।’ উল্লেখ্য, সরকার নির্ধারিত ভাড়া হচ্ছে প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৪২ পয়সা।

ধর্মঘট নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অলি আহমেদ বলেন, আমরা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করছি না। বিআরটিএর ম্যাজিস্ট্রেট সরকারি গেজেট না দেখে কয়েকটি পরিবহন সংস্থাকে জরিমানা করেছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে শ্রমিকরা গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে জেলা প্রশাসনের আশ্বাসে আমরা গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক করেছি।’

চট্টগ্রামে গণপরিবহন সেক্টরে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। গ্রামের সিএনজি অটোরিকশা শহর এলাকায় ঢুকে যাত্রী পরিবহন করছে। কর্ণফুলী সেতুর দক্ষিণ পাশে মইজ্জ্যারটেক পর্যন্ত গ্রামের সিএনজিগুলো যাত্রী পরিবহনের অনুমোদন রয়েছে। অথচ প্রতিদিন অসংখ্য গ্রামের সিএনজি কর্ণফুলী সেতু পার হয়ে শহর এলাকা থেকে যাত্রী পরিবহন করছে। বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়ায় আদায় করা হচ্ছে। নগরীর মধ্যে চলাচলরত টেম্পু, মাহিন্দ্রা ও লেগুনা গাড়িগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। গত এক সপ্তাহ যাবত্ বহদ্দারহাট থেকে রিয়াজউদ্দিন বাজার আমতল পর্যন্ত চলাচলরত টেম্পুগুলো বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়াই ২ টাকা হারে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। এছাড়া মুরাদপুর থেকে কর্ণফুলী সেতু পর্যন্ত চলাচলরত টেম্পু ও মাহিন্দ্রাগুলো অন্য গাড়ির চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করছে।

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা জানান, গণপরিবহনের প্রায় ৮০ শতাংশ গাড়ির ডকুমেন্ট ত্রুটিপূর্ণ। গাড়ির সামনের লাইট নেই, জানালার গ্লাস ভাঙা,গাড়ির রঙ উঠে গেছে। মামলা নিয়েই এসব গাড়ি চলাচল করছে। একটি গাড়ির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ জানায়, ট্রাফিক আইন অমান্য করার দায়ে প্রতিদিন বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে শত শত মামলা হচ্ছে। প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ৯/১০ হাজার মামলা হয়ে থাকে।

জানা যায়, একটি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাকে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় দেয়া হয়। আবার এই সময়ের মধ্যে অন্য অপরাধে আরো কয়েকটি মামলা দেয়া হয়ে থাকে। এতে গাড়ির মালিকরাও জরিমানার টাকা দিয়ে রাস্তায় গাড়ি চালায় কিন্তু ডকুমেন্ট আপডেট করার জন্য বিআরটিএতে যায় না বলে অনেক গাড়ির মালিক স্বীকার করেছে।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, প্রাইভেট গাড়ির চারটি ও অন্যান্য গাড়ির পাঁচটি ডকুমেন্ট ঠিক থাকলে ত্রুটিমুক্ত বলা হয়। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন, রুট পারমিট ও গাড়ির ইন্স্যুরেন্স। এর বাইরে রয়েছে ড্রাইভিং লাইসেন্স।