ঘরের আঙিনা থেকে পাঁচ একর জমি

নারী ক্ষমতায়নে দিকপাল এখন কৃষাণী সুলেখা

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৩:১৫

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম ঝিকরা। সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পেরোনো সুলেখা বিয়ের পর ঝিকরা গ্রামেই শুরু করেন তার নতুন জীবন। গ্রাম্য চিকিৎসক দরিদ্র বাবার বাড়িতে আট ভাই-বোনের সংসার; বিয়ের পর স্বামীর স্বল্প আয় ও পারিবারিক আর্থিক সংকট তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

সেই সময়ের কথা স্মরণ করে সুলেখা বলেন, “বিয়ের সময় আমি পড়াশোনা করছিলাম। স্বামীর স্থায়ী আয় না থাকায় আমাদের পরিবারে আর্থিক অনিশ্চয়তা ছিল। স্বামীর বাড়ির লোকেরা আমাকে পরিবারের জন্য বোঝা মনে করত।”

পরিবারের লোকজনের কটু কথায় কষ্ট পেলেও তার স্বপ্ন ছিল আরও পড়ালেখা করার। শত প্রতিকূলতার মাঝেও পড়াশোনা চালিয়ে যান সুলেখা। পাশাপাশি বাড়ির পেছনের ছোট্ট এক টুকরো জমিতে চাষাবাদ শুরু করেন ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়। কিন্তু প্রথমদিকে অবস্থার কোনো পরিবর্তন আসেনি। কৃষি-সংক্রান্ত পর্যাপ্ত জ্ঞান, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তার অভাব এবং নারী হিসেবে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তার পথচলা সহজ ছিল না। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি। সেদিনের সেই অসহায় সুলেখা আজ পাশের কয়েকটি গ্রামের শত নারী কৃষকের জন্য অনুপ্রেরণা।

এসএসসি পাস করার পর স্থানীয় একটি এনজিওতে স্বল্প বেতনে চাকরি নেন সুলেখা। স্বামী তখন বেকার। সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। পাশাপাশি চলতে থাকে পড়াশোনা। সুলেখা বলেন, “এরই মধ্যে আমি প্রথমবার মা হই। পুষ্টিকর খাবার তো দূরের কথা, তিন বেলা ভাতই জুটত না। আমার সন্তানটি জন্মের পরপরই মারা যায়। এরপর শ্বশুরবাড়িতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।”

তবুও ঘুরে দাঁড়ান সুলেখা। চাকরির টাকা একটু একটু করে জমিয়ে একটি গাভী কেনেন এবং এক বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেন। ‘ঘরের বউ সংসার সামলাবে, মাঠে কৃষিকাজ করবে কেন’—এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে প্রতিনিয়ত। কিন্তু থেমে যাননি তিনি।

২০২৩ সালে এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে তিনি একটি কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কথা জানতে পারেন—“ফার্মার স্কুল”। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ ইউনিয়নে স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় সিনজেনটা বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে দেশের প্রথম “ফার্মার স্কুল”—একটি সমন্বিত শিক্ষা ও সচেতনতা কেন্দ্র, যা আধুনিক কৃষি জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চর্চার মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষমতায়নে কাজ করছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, সার ও কৃষি উপকরণের সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার, শস্যের জন্য পরিমিত পুষ্টি নিশ্চিত করে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে এই ফার্মার স্কুল। আধুনিক চাষাবাদের মাধ্যমে স্মার্ট কৃষক তৈরি করে টেকসই কৃষি উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনই এর মূল লক্ষ্য।

সিনজেনটার ফার্মার স্কুল থেকে ফসলের পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, সঠিক চাষ পদ্ধতি, বালাই দমন, সার প্রয়োগ কৌশল, মাটির স্বাস্থ্য, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, এমনকি গবাদিপশু ও মৎস্য ব্যবস্থাপনাসহ আয়বর্ধনমূলক নানা বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেন সুলেখা। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তিনি পান কৃষি ঋণ এবং অভিজ্ঞ মেন্টরদের পরামর্শ। ফলও পান হাতেনাতে।

বাড়ির পেছনের ছোট্ট এক টুকরো জমিতে শুরু করা চাষাবাদ আজ প্রায় ১৬ বিঘা জমিতে বিস্তৃত হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে সাতটি বড় আমবাগান এবং একটি ছোট গরুর খামার। বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রান্তরে কৃষিকাজ অসংখ্য নারীর জন্য শুধু পেশা নয়; এটি টিকে থাকার সংগ্রাম, আত্মমর্যাদার লড়াই এবং স্বপ্নপূরণের পথ।

সুলেখার এই সাফল্য কেবল তার নিজের নয়। তিনি জাতীয় পর্যায়ে ‘জয়িতা’ পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি অন্য নারী কৃষকদের পরামর্শ দেন এবং একজন সফল কমিউনিটি লিডার হিসেবে পরিচিত।

সুলেখা সম্পর্কে চারঘাট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “সুলেখা সত্যিই একজন জয়িতা, যিনি দুঃখ, কষ্ট ও দারিদ্র্যকে জয় করেছেন নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে। তিনি এলাকার অন্য নারীদের জন্য একটি উদাহরণ। সিনজেনটা ফার্মার স্কুল তার কৃষিকাজে যে উৎসাহ ও সহায়তা দিয়েছে তা প্রশংসনীয়।”

সিনজেনটা ফার্মার স্কুল কেবল একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়; এটি একটি কৃষি ইকোসিস্টেম, যেখানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, দাতা সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একত্রে কৃষকদের পাশে কাজ করছে। মাত্র দুই বছরে প্রায় ১,৫০০ ক্ষুদ্র চাষি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় এসেছেন, যার মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই নারী। এটি দেশের কৃষিতে নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতির একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

সুলেখা বলেন, “ফার্মার স্কুলে আমি ফসলের পুষ্টি, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, পোকামাকড় দমন ও সার প্রয়োগের সঠিক কৌশল শিখেছি। এই জ্ঞান আমার ফলন বাড়িয়েছে, খরচ কমিয়েছে এবং আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে।”

বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক পরিবারের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই ক্ষুদ্র চাষি, যারা দুই একর বা তার কম জমিতে চাষ করেন। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি, আমসহ নানা ফসল উৎপাদন করে তারা শুধু নিজেদের পরিবার নয়, দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছেন। তবে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—খরা ও বন্যার মতো চ্যালেঞ্জ তাদের প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করে।

সিনজেনটা বাংলাদেশের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের ফার্মার স্কুল ইতোমধ্যে স্থানীয় কৃষক সমাজে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। কৃষক-কৃষাণীরা নিয়মিত এখানে এসে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে কৃষি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান পাচ্ছেন। আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকরা হয়ে উঠছেন আরও দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর। এছাড়া নারী কৃষকদের জন্য আয়োজিত নারী ক্ষমতায়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ তাদের সামাজিক ও মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”

ফার্মার স্কুলের উপকারভোগী সুলেখা আজ শুধু একজন সফল কৃষক নন; তিনি অন্য নারীদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর। তিনি বলেন, “আমি চাই আমাদের গ্রামের আরও নারীরা কৃষিতে এগিয়ে আসুক। সঠিক প্রশিক্ষণ ও সাহস থাকলে নারীরাও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।”

নিজের এই সাফল্য নিয়ে তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, “আজ আমি শুধু আমার পরিবারকে সহযোগিতা করছি না; একজন স্বাবলম্বী কৃষক হিসেবে সমাজে সম্মানও অর্জন করেছি।”

সুলেখা খাতুনসহ আরও হাজারো গ্রামীণ নারীর পাশে থেকে যেভাবে ‘ফার্মার স্কুল’ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তা কেবল উত্তরবঙ্গ নয়; সারা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, টেকসই কৃষি উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ইত্তেফাক/এএইচপি