বাংলাদেশে উদ্ভাবনীশক্তির বিকাশ

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৯, ২১:১৯

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

ত্একটি রাষ্ট্রের সম্প্রসারণশীল বিকাশ নির্ভর করে রাষ্ট্রের নাগরিকদের উদ্ভাবনীশক্তির ওপর। কারণ উদ্ভাবনীশক্তি ব্যক্তিসত্তার মাধ্যমে সামগ্রিক সত্তাকে প্রভাবিত করে। ফলে একসময় সেটি রাষ্ট্রের সম্পদে পরিণত হয়। এই উদ্ভাবনীশক্তির ভিত্তি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশেষায়িত মানুষ পর্যন্ত হতে পারে। যেমন রাষ্ট্রের যে বিভিন্ন সমস্যাগুলো বিদ্যমান আছে তা নিয়ে মানুষ যাতে ভাবতে পারে, এই ধরনের পরিবেশ কেবল উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তির ক্ষেত্র তৈরি করার মাধ্যমে সম্ভব। এ প্রসঙ্গে হরিধানের উদ্ভাবক হরিপদ কাপালীর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

 ঝিনাইদহ উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামে একজন সাধারণ কৃষক, যিনি সৃষ্টিশীল দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব আনতে পারেন—এটি তার উদাহরণ। আবার ড. মাকসুদুল আলম ও তার গবেষক দল ২০১০ সালে পাটের জিনতত্ত্ব উদ্ভাবনীশক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে আবিষ্কার করেন। যেটি পরবর্তী সময়ে পাটের জিনোম সিকোয়েন্স নামে পরিচিত হয়। এখানে একটি বিষয় বলা যেতে পারে, উদ্ভাবনীশক্তি সৃষ্টির ক্ষেত্রে সামাজিক স্তর ও শ্রেণিবিন্যাসের প্রভাব মুখ্য নয়। এক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক চিন্তাধারারও তেমন একটা প্রভাব নেই। অন্য একটি বিষয় হলো শুধু পুথিগত শিক্ষা মানুষের মধ্যে সৃজনশীল চিন্তা করার ক্ষেত্র তৈরি করে না, বরং জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান বিতরণ, জ্ঞান সৃষ্টি আর স্বশিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, টমাস আলভা এডিশন, রাইট ব্রাদার্স—তাদের শিক্ষার ভিত্তি না থাকলেও তাদের উদ্ভাবনীশক্তি ও নুতন জ্ঞান সৃষ্টির ধারণা তাদেরকে বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে পরিগণিত করেছে। অন্যদিকে বিলগেটস হার্ভাডের মতো বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও তার ডিগ্রি শেষ করতে পারেননি। কিন্তু ফরমাল শিক্ষার অবসান ঘটলেও তিনি তার উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গিকে গৌণ হিসেবে বিবেচনা করেননি। ফলে মাক্রোসফটের মতো ক্রিয়েটিভ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। অন্য দিকে টমাস আলভা এডিশন তার প্রযুক্তিমুখী সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রচুর সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। ল্যারি এলিসন ওরাকল প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনিও তার কলেজের ডিগ্রি শেষ করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর উদ্যোগ ও উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি তার চিন্তাধারার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে। বাংলাদেশে উদ্ভাবনীশক্তির বিকাশ ঘটেছে কিন্তু এই বিকাশকে লালনপালন করে একটি ফলবান বৃক্ষে পরিণত করার তেমন একটা প্রচেষ্টা ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চাকরিজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘শুধু রুটিন দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উদ্ভাবনীশক্তি দিয়ে আরো কী কাজ করলে মানুষের কল্যাণ হয়, সেটা চিন্তা করে সেভাবেই পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি চাকরি যে একটা রুটিন চাকরি, আসলাম, বেতন নিলাম, চলে গেলাম সেটা নয়, নিজের ভেতরে উদ্ভাবনীশক্তি কী আছে সেটাও কাজে লাগাতে হবে। নিজেই নিজেকে আবিষ্কার করতে হবে। যেখানে যে দায়িত্বপ্রাপ্ত তাকে সেখানে ভাবতে হবে এটা আমার নিজের দায়িত্ব, কারণ এই দেশটা আমার। দেশের মানুষগুলো আমার। কাজেই দেশের মানুষের কল্যাণে আমাদের কাজ করতে হবে।’ এখানে উদ্ভাবনীশক্তি প্রয়োগ করে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রগঠনের ধারণাকে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। আবার দেশপ্রেমের সঙ্গে উদ্ভাবনী চিন্তাধারার যে যোগসূত্র রয়েছে তাকে তাত্ত্বিক ও প্রয়োগিক ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নিজ থেকে উদ্যোগ গ্রহণের প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, খুলনার জেলা প্রশাসন কল্যাণমুখী উদ্ভাবনী ধারণার প্রণোদনা প্রয়োগ করে সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পুলিশ প্রশাসনের এক দিনের বেতন দিয়ে ভিক্ষুকমুক্ত করার জন্য একটি ফান্ড গঠন করেছেন। এই অর্থ ব্যবহার করে ভিক্ষুকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

আমাদের দেশে কীভাবে উদ্ভাবনীশক্তি মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে উন্নত রাষ্ট্র গঠন করা যেতে পারে, তার কোনো ধরনের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক মৌলিক ও ফলিত গবেষণা হচ্ছে না। এর জন্য যেমন উদ্ভাবনী চিন্তাধারার কর্মকৌশল তৈরির জন্য জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন তেমনি উদ্ভাবনী গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা দরকার। যেখানে শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনীর বিষয়টি থাকবে না বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক, মূল্যবোধ তৈরি, উন্নত চিন্তাধারা, দেশপ্রেম, লেখার বৈচিত্র্য, শিল্পীর সৃষ্টিশীলতা, শিল্প, নাট্যকলা, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সব ধরনের উদ্ভাবনীর বিষয়টি সম্পৃক্ত হবে। ইনভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ মিনিস্ট্রি গঠনের মাধ্যমে উদ্ভাবন ও গবেষণাকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। উদ্ভাবনকে রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্রের নাগরিকের সম্পদে পরিণত করার জন্য পেটেন্ট বা মালিকানার অধিকার সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। তা না হলে একজন নাগরিকের উদ্ভাবন ও আইডিয়া চুরি হয়ে যেতে পারে উন্নত দেশে। যেমন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বোস বেতারের প্রথম আবিষ্কারক হলেও বিশ্বের মানুষ জানে এটি মার্কনির অবদান। বাংলাদেশে পেটেন্ট আইন ও সংস্থা থাকলেও তাদের কার্যক্রম সমন্ধে মানুষের তেমন একটা ধারণা নেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেস্ব তরুণদের উদ্যোগে বিভিন্ন উদ্ভাবনী ক্লাব বা গ্রুপ গড়ে উঠলেও তাদেরকে সম্বনিত করে উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশের পদক্ষেপ বাস্তবে তেমন একটা নেই। আবার একসময় জাতীয় বিজ্ঞান মেলা বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে হলেও তা ধীরে ধীরে নিরুত্সাহিত হচ্ছে। এখানে একটি বিষয় যুক্ত করে বয়সভিত্তিক জাতীয় উদ্ভাবনী ও গবেষণা পুরস্কার প্রতিবছর প্রদান করে প্রণোদনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এছাড়া জাতীয় উদ্ভাবনী সপ্তাহ ও মেলা আয়োজন করে সব শ্রেণির সব বয়সের মানুষদের উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। সোসাইটি অব ইনভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ গঠন করে মানুষের মধ্যে উদ্ভাবনের ধারণাকে পৌঁছে দেওয়া দরকার। তবে এটুআই প্রজেক্টের মাধ্যমে ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলা, ক্রিয়েটিভ আইডিয়া জেনারেশন, তথ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে সারা দেশকে একটি নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।

ড. কুদরাত-এ-খুদার গবেষণার হাতেখড়ি স্টেরিও রসায়ন নিয়ে হলেও পরবর্তী সময়ে গবেষণার বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হয়ে বনৌষধি, গাছগাছড়ার গুণাগুণ, পাট, লবণ, কাঠকয়লা, মৃত্তিকা ও অনান্য খনিজ পদার্থসংক্রান্ত দেশজ গবেষণায় সম্পৃক্ত হন। বিজ্ঞানী হিসেবে তার ১৮টি আবিষ্কারের পেটেন্ট রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি পাটসংক্রান্ত। যেগুলোর মধ্যে পাট ও পাটকাঠি থেকে রেয়ন, পাটকাঠি থেকে কাগজ এবং রস ও গুড় থেকে মল্ট ভিনেগার আবিষ্কার উল্লেখযোগ্য। ডাক্তার শাহ এম ফারুক, ড. আনিসুর রাহমান, ড. জামালউদ্দিন, মেঘনাদ সাহা, আজম আলী, আবেদ চৌধুরী, আব্দুস সাত্তার খান, পি সি রায়, ড. মাকসুদুল আলম, ড. আতাউল করিম, অধ্যাপক আবুল হুসসাম, রেজাউল করিম, ড. মো. আব্দুল আহাদ, শুভ রায়, ড. মুশফিক আহমদ, ড. অধ্যাপক ওসমান গনি তালুকদার, সত্যেন্দ্রনাথ বসু সহ বিজ্ঞানীরা দেশ-বিদেশে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন বাঙালিরা উদ্ভাবনীশক্তিকে প্রয়োগ করে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। এখন প্রয়োজন সন্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে উদ্ভাবনী চিন্তাধারা প্রয়োগ করে সকলকে একসঙ্গে বাস্তবে কাজ করা। তবেই উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন সম্ভাবনায় রূপান্তরিত হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন দেশপ্রেমের আবেগকে কাজে লাগানো ।

লেখক : ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর