ফেসবুকে মাঝেমধ্যেই দেখি—“৪০-এর নারী”, “৫০-এর নারী”—এসব নিয়ে নানা অনুপ্রেরণামূলক লেখা। যেন এই বয়সে পৌঁছালেই জীবন আবার নতুন করে ধরা দেয়। পড়তে ভালো লাগে, কিন্তু হঠাৎ মনে হয়—এই বয়সী নারীরা আসলে কেমন দিন কাটান, তা কি সত্যিই কেউ দেখে?
বাহ্যিকভাবে তারা নীরব, হাসিমুখে থাকে ঠিকই, কিন্তু ভিতরে বহন করে কত না-কথা—যা বলা যায় না, আর বললেও কেউ বোঝে না।
মানুষের জীবনের দ্বিতীয় অর্ধেক—৫০, ৫৫, ৬০, ৬৫ এই সময়টা বাইরে থেকে মুক্ত মনে হলেও ভেতরে কতটা সংকীর্ণ, তা নারী ছাড়া আর কেউ জানে না। স্বামী থাকলে সংসারে অন্তত কেউ কথা বলে, দায়িত্ব থাকে। স্বামী না থাকলে সেই সংসারই যেন আচমকা খোলশের মতো ঝরে পড়ে যায়—ঘর থাকে, কিন্তু “নিজের” কিছু থাকে না। সন্তানরা বড় হয়ে যায়, নাতি–নাতনিরাও তখন বড় হচ্ছে। নারী তখন পরিবারের সদস্য নয়, বরং দায় এটাই বাস্তব, যতই শব্দটাকে নরম করে বলা হোক।
শরীর তো আর আগের মতো থাকে না; এখানে–সেখানে ব্যথা, মাঝেমধ্যে ক্লান্তি। ছেলে–মেয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু সেই ‘যাওয়া–আসা’র ভেতরে যে একাকীত্ব থাকে, তা আর কেউ অনুভব করে না।
প্রবাসী সন্তানের মায়েদের অবস্থা আরও কঠিন ওদের দিনের পর দিন কাটে গৃহকর্মীর হাতে ভর দিয়ে। অসুস্থ হলে দূরের কেউ এসে যত্ন নেয়, নইলে দিনের পর দিন একই চারদেয়ালের ভেতর নিঃসঙ্গ অপেক্ষা কখন ফোন আসবে, কখন কেউ দরজায় কড়া নাড়বে।
যারা শারীরিকভাবে একটু ভালো আছেন, তাদের অন্য রকম গল্প। সন্তান ও তাদের পরিবারের পছন্দ অপছন্দের তাল মিলিয়ে রান্না, গোছগাছ, যত্ন সেটাই যেন তাঁদের প্রধান কাজ। ছেলে ছোটবেলায় যে মাছ ছুঁতো না, এখন নাকি ‘মায়ের হাতের রাঁধা’ না হলে চলে না। নাতি–নাতনি নাকি কম তেলে, কম মশলায় রান্না খায় তাই নতুন রেসিপি শিখে আবার সেগুলোও তৈরি করেন। কারোর জামাই পছন্দ করে একটা খাবার, কারো বউমা আরেকটা সব ধরনের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চলতেই দিন কেটে যায়।
নিজস্ব পছন্দ? সেই তো বহু আগেই হারিয়ে গেছে।
সন্তানরা মাঝেমধ্যে বেড়াতে নিয়ে যায় কক্সবাজার, কোনো রিসোর্ট, আত্মীয়ের বাড়ি। ছবি তোলে, পোস্ট দেয়, ভালোবাসা দেখায়; কিন্তু সেসবের ভেতরে নারীর নিজের জন্য সময় থাকে কতটুকু?
কোথাও গেলে তাদের আলাদা ঘর থাকলেও সেটা নাতনির খেলনার ঘর বা পড়ার টেবিলের পাশে। ব্যক্তিগত পরিসর বলে কিছু নেই এই বয়সেও নেই।
এখন প্রশ্ন—এ কি সত্যিই স্বাধীনতা?
স্বাধীনতা তো মানে নিজের মতো থাকা।
আজ রান্না করতে ইচ্ছে না– করলে না।
আজ শুধু ভাত–ভর্তা খেয়ে সারাদিন গল্পের বই পড়লেন—কেউ প্রশ্ন করল না। আজ মাথা ব্যথা তাই বাড়তি কাজ করলেন না।
আজ বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলেন—কেউ ভ্রু কুঁচকাল না।
এটাই স্বাধীনতা।
কিন্তু এ বয়সী নারী কি তা পান?
বরঞ্চ তাঁর ইচ্ছাগুলো চাপা পড়ে থাকে অন্যদের প্রয়োজনের নিচে। সারাজীবন যে দায়িত্ব পালন করতে করতে নিজের জীবনই শেষ করে ফেলেছেন, পড়ন্ত বয়সেও সেই অভ্যাস থেকে মুক্তি মেলে না। যদি কখনো তিনি নিজের মতো শাড়ি পরেন, একটু রঙিন লিপস্টিক দেন, বন্ধুদের সাথে দেখা করেন বাধাটা শুরু হয় নিজের মেয়েকেই দিয়ে। মা “এভাবে” চললে নাকি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে কথা ওঠে। আর ছেলে? সে-ও অনেক সময় স্ত্রীর কথায় মাকে ভেতরে–ভেতরে দোষারোপ করতে থাকে। যেন মায়ের পোশাক, পছন্দ, আনন্দ সবকিছুই পরিবারের সম্মানের ওপর হুমকি।
এভাবে অদৃশ্য দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে তাঁর চারপাশে উঠে যায়, আর তিনি ক্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অনেক নারীর শেষ বয়সটা নিজের অপূর্ণ ইচ্ছার ভার নিয়ে নিঃশব্দে কাটে।
হয়তো সবকিছু বদলে যেত যদি—
মেয়েরা একটু ভাবত,
ছেলেরা একটু খেয়াল করত,
বউমা–জামাই একটু সহানুভূতিশীল হতো,
নাতি–নাতনিরা একটু সময় দিত,
আর তারা সবাই মিলে নারীটিকে আবার নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ দিত।
এতটা পথ অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে মায়ের যখন এখন ছুটি কাটাবার সময় হলো তখন আমরা সন্তানরা তাদেরকে আবার শেকল পরাতে চাই। তাদেরকে নিয়মে বেঁধে রাখতে চাই। তাকে আঘাত করি। তাদের কাঁধে স্বার্থপরের মতো নিজের সংসারের জোয়ালটা চাপিয়ে দিয়ে ভাবি একটু নড়াচড়া করা ভালো। এতে মায়েরই স্বার্থ, এটুকু না করলে মা অসুস্থ হয়ে যাবে।
শুধু মা নিজে কী চান, মায়ের মন কীসে ভালো থাকবে সেই খোঁজ আমরা ক’জন নেই!
