পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে এত ব্যবধান কেন?

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৭:১৫

ইতিমধ্যেই রাজধানী ঢাকা হইতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঈদযাত্রার স্রোত সৃষ্টি হইয়াছে। দুঃখজনকভাবে এই আনন্দযাত্রার অন্তরালে অনেক সময় লুকাইয়া থাকে এক নির্মম বাস্তবতা-সড়ক দুর্ঘটনা। শনিবার (১৪ মার্চ) পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, দেশের কমপক্ষে ৩১৪টি এলাকা সড়ক দুর্ঘটনার বিভিন্ন মাত্রার ঝুঁকিতে রহিয়াছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ২০২০ হইতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করিয়া এই অঞ্চলসমূহ শনাক্ত করিয়াছে। ইহার মধ্যে ১৩৯টি এলাকা অতি দুর্ঘটনাপ্রবণ এবং ১৭৫টি এলাকা দুর্ঘটনাপ্রবণ বলিয়া চিহ্নিত। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হইল-এই তালিকার মধ্যে ২১টি অঞ্চলকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করা হইয়াছে। অর্থাৎ দেশের সড়কপথে এমন অনেক স্থান আছে, যেইখানে দুর্ঘটনা যেন এক নিয়মিত ঘটনার ন্যায় পরিগণিত হইতেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে সবচাইতে বিস্ময়কর তথ্য হইল-প্রায় ৮৫ শতাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ অতিরিক্ত গতি। আধুনিক সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণের ফলে যানবাহনের গতি বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক; কিন্তু যদি সেই গতিকে নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তাহা হইলে উন্নত সড়কই বিপদের উৎসে পরিণত হয়। আমাদের দেশে নূতন নূতন মহাসড়ক নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ হইতেছে; কিন্তু ইহার পাশাপাশি গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত নজরদারির উন্নয়ন সমান তালে ঘটিতেছে কি না-তাহা বিবেচনায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা প্রতিবেদনে দুর্ঘটনাপ্রবণ হইবার পিছনে একাধিক কারণের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। কোথাও সড়কের নকশাগত ত্রুটি, কোথাও সড়ক বিভাজক বা সতর্কতামূলক চিহ্নের অভাব, কোথাও আবার সড়কের দুই পার্শ্বে অনিয়ন্ত্রিত জনবসতি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াইয়া তুলিতেছে। এই বিষয়গুলি ইতিপূর্বে আমরা একাধিক সম্পাদকীয়তে তুলিয়া ধরিয়াছি। আমরা দেখিতে পাই, মহাসড়কের পাশে অসংখ্য বাস কাউন্টার, যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের রাস্তা পারাপার করিয়া থাকে। সড়ক যখন কেবল যানবাহনের চলাচলের জন্য নহে, বরং মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের অংশে পরিণত হয়, তখন দুর্ঘটনার আশঙ্কাও স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।

অন্যদিকে একটি বিশেষ সমস্যা হইল দূরপাল্লার চালকদের বিশ্রামের অভাব। দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালাইলে মানুষের মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়াক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কমিয়া যায়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রাখিয়াই ২২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি আধুনিক বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হইয়াছিল-কুমিল্লার নিমসার, সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়া, মাগুরার লক্ষ্মীকান্দর ও হবিগঞ্জের জগদীশপুরে; কিন্তু দুঃখজনকভাবে নির্মাণকাজ শেষ হইবার পরও এই বিশ্রামাগারসমূহ চালু করা হয় নাই। অর্থাৎ যে অবকাঠামো চালকদের ক্লান্তি দূর করিয়া দুর্ঘটনা হ্রাসে সহায়ক হইতে পারিত, তাহাই আজ কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় রহিয়া গিয়াছে। এইখানেই আমাদের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হইয়া উঠে। কেন এই ব্যবধান-তাহা এক বিস্ময়-প্রশ্ন।

সড়ক উন্নয়ন কেবল ইট, বালু ও বিটুমিনের সমষ্টি নহে-ইহা একটি সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ। উন্নত সড়কের সহিত যদি গতিনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, কার্যকর ট্রাফিক নজরদারি, প্রশিক্ষিত চালক এবং প্রয়োজনীয় বিশ্রামব্যবস্থা না থাকে, তাহা হইলে সেই উন্নয়ন অনেক সময় নূতন ঝুঁকির জন্ম দেয়। ঈদের সময় এই বাস্তবতা আরও তীব্রভাবে প্রতিভাত হয়। কারণ এই সময় সড়কে যানবাহনের সংখ্যা যেমন বাড়ে, তেমনি অনেক চালক দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাইবার তাড়নায় গতিসীমা অমান্য করিয়া বসেন। যাত্রীরা নিজেরাও কখনো কখনো দ্রুত যাত্রার চাপ সৃষ্টি করেন। অথচ একটি মুহূর্তের অসাবধানতা যে কত বড় বিপর্যয়ের কারণ হইতে পারে, তাহা আমরা প্রায় প্রতি বৎসরই সংবাদপত্রের পাতায় প্রত্যক্ষ করি।
অতএব, প্রশ্নটি কেবল অবকাঠামোর নহে-ইহা আচরণ ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও। ঈদ মানে আনন্দের যাত্রা, প্রিয়জনের নিকট ফিরা। সুতরাং আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন-সড়কে দ্রুত পৌঁছানো নহে, নিরাপদে পৌঁছানোই প্রকৃত সাফল্য।

ইত্তেফাক/এমএস