বিকাশ, পুনর্গঠন ও ব্যবসায় নারীর নেতৃত্বে দুই দশকের যাত্রা

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১৭:৫২

২০০৪ সালে ইউনিলিভার বাংলাদেশে আমার যাত্রা শুরু। তখন মডার্ন ট্রেড একেবারেই নতুন ছিল এবং ডিজিটাল মূলত ভবিষ্যতের সম্ভাবনা হিসেবে ধরা হত। আমিও নতুন ছিলাম। সামনে ছিল অজানা পথ। নতুন কিছু তৈরি করার উত্তেজনা যেমন ছিল, তেমনি ছিল অনিশ্চয়তার চাপ, ভুল করার ভয় এবং প্রতিদিন কিছু শেখার আগ্রহ।

শুরুর কাজগুলো মূলত অপারেশনাল ছিল। দোকানের শেলফে কোন পণ্য কোথায় থাকবে, ডিসপ্লে প্ল্যানোগ্রাম তৈরি করা, সরাসরি ট্রেড পার্টনারদের সঙ্গে কাজ এবং সাপ্লাই সমন্বয় করা ছিল দৈনন্দিন দায়িত্ব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজের পরিধি বড় হয়েছে। এখন শুধু বাস্তবায়ন নয়। বিভিন্ন বিভাগের কাজ একসঙ্গে সমন্বয় করা, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করা, ব্যবসাকে ডিজিটালি সক্ষম রাখা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন আমার মূল ভূমিকা। এই প্রায় দুই দশকের যাত্রায় মাঝখানে ছয় বছরের কর্মবিরতিও ছিল।

দায়িত্ব ও ভূমিকার পরিবর্তন যতই ঘটুক, কিছু মূল্যবোধ আমার পেশাগত যাত্রায় সব সময় অপরিবর্তিত থেকেছে।সত্যনিষ্ঠা, মানুষের প্রতি সম্মান, শেখার মানসিকতা, প্রতিকূলতায় স্থিত থাকা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এগুলোই নেতৃত্বের পথে আমাকে স্থির রেখেছে।

কর্মজীবনে বিরতির পর ফিরে আসা সহজ ছিল না। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজেকে আবার প্রাসঙ্গিক এবং সক্ষম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য এবং শেখার আগ্রহ আমাকে এগিয়ে নিয়েছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতিও বড় ভূমিকা রেখেছে। আমার কর্মবিরতিকে কখনো দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়নি। বরং আমাকে মূল্যায়ন করা হয়েছে আমার কাজ, দক্ষতা এবং অবদানের ভিত্তিতে। এই আস্থা আমাকে নতুন শক্তি দিয়েছে।

আমার এই অভিজ্ঞতা বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। একসময় সেলস খাত পুরুষ প্রাধান্যপূর্ণ ছিল। তখন প্রশ্ন হতো একজন নারী এই পেশায় টিকে থাকতে পারবেন কি না। এখন প্রশ্ন বদলেছে। এখন আলোচনায় থাকে একজন নারী কত দ্রুত নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবেন। পরিবর্তন শুধু সংখ্যায় নয়, মানসিকতাতেও এসেছে। আজকের ব্যবসায় যোগাযোগ দক্ষতা, সম্পর্ক গড়ে তোলা, আলোচনায় পারদর্শিতা এবং গ্রাহকের মনোভাব বোঝার ক্ষমতাই নেতৃত্বের মূল শক্তি।

খুচরা বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত রূপান্তর নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ডিজিটাল কমার্স সেই সুযোগের একটি বড় উদাহরণ। এটি তুলনামূলকভাবে বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক যেখানে লিঙ্গের চেয়ে দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডেটা বিশ্লেষণ, সৃজনশীল উপস্থাপন, গ্রাহকের আচরণ বোঝা এবং দ্রুত অভিযোজনই সাফল্যের মূল ভিত্তি।

ডিজিটাল কমার্স আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা দিয়েছে। তুলনামূলক কম মূলধনে ব্যবসা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রান্তিক অঞ্চলের নারীরাও বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন। এতে ব্যবসার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। তবে সীমাবদ্ধতাও আছে। ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের বৈষম্য, ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি এবং অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ এখনো অনেকের বাস্তবতা। তাই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি সমতার বিষয়ও।

ইউনিলিভার বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি জেন্ডার ভারসাম্য কোনো নীতি নয়। এটি প্রতিদিনের চর্চা। পারফরম্যান্স মূল্যায়নে লিঙ্গভিত্তিক কোনো ভেদাভেদ নেই। দক্ষতাই একমাত্র নির্ধারক। মিটিং কক্ষে নারী উপস্থিতি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়। তাদের মতামত এবং সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। সমান সুযোগ, মেন্টরশিপ এবং স্পনসরশিপের মতো উদ্যোগ নারী নেতৃত্বকে স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত করেছে।

ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেও নারী নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু সামাজিক ন্যায্যতার বিষয় নয়। এটি প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং আর্থিক ফলাফলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বৈচিত্র্যময় নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয় এবং নতুন ধারণা জন্ম নেয়। আন্তর্জাতিক গবেষণাও দেখায় নারী নেতৃত্ব বাড়লে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল উন্নত হতে পারে। তাই নারীর উন্নয়নে বিনিয়োগ কোনো অতিরিক্ত উদ্যোগ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার একটি কৌশল।

আগামী প্রজন্মের নারী নেতৃত্ব তৈরিতে আমি তিনটি বিষয়ে জোর দিই। আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা, দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করা এবং মেন্টরশিপ। পেশাগত জীবনে চ্যালেঞ্জ এবং অনিশ্চয়তা থাকবেই। তাই নিজের সক্ষমতা উন্নয়নে সচেতন বিনিয়োগ, দক্ষতা নিয়মিত উন্নত করা এবং শেখার মানসিকতা ধরে রাখা শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তোলে।

লেখক: হেড অব মডার্ন ট্রেড অ্যান্ড ই–কমার্স, ইউনিলিভার বাংলাদেশ

ইত্তেফাক/এএম