১৭ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই সময় ছিল আন্দোলনের সময়। ছিল মিছিল, দমনপীড়ন এবং প্রতিরোধের কঠিন বাস্তবতা। সেই অধ্যায় পেরিয়ে এখন শুরু হয়েছে নতুন পর্ব। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণ তাদের রায় দিয়েছে। দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি।
ঠিক এক মাস আগে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় গতি আনতে হবে। গত এক মাসে সেই বার্তারই প্রতিফলন দেখা গেছে।
প্রথম মাসকে অনেকে কর্মব্যস্ত সূচনা বলছেন। কারণ স্বল্প সময়ে নানা খাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ শুধু প্রশাসনিক নয়। এগুলো রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ছিল সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। হাজার হাজার পরিবার এর আওতায় এসেছে। তারা মাসিক আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। অনেক পরিবার প্রথমবারের মতো একটি স্থিতিশীল সহায়তা পেয়েছে।
ধর্মীয় সেবকদের জন্য ভাতা চালু করা হয়েছে। ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের পাশাপাশি পুরোহিত, বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ এবং গির্জার যাজকরাও এই সুবিধা পাচ্ছেন। এতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের বার্তা গেছে। রমজান ও ঈদ উপলক্ষে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়েছে। পোশাক বিতরণ করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য বিশেষ উপহার দেওয়া হয়েছে। এতে সামাজিক সংহতির বার্তা শক্তিশালী হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আলেমদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। লক্ষ্য হলো দানকে সংগঠিত করা এবং তা দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো। কৃষি খাতে নেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরছে।
পানি ব্যবস্থাপনায় বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খাল খনন শুরু হয়েছে। জলাশয় পুনরুদ্ধার চলছে। এতে সেচ সুবিধা বাড়বে। জলাবদ্ধতা কমবে। কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি নতুন কাজের সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরলতা আনার উদ্যোগও চোখে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কমানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচল সহজ হয়েছে।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতাও সীমিত করা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের বিশেষ সুবিধা কমানো হয়েছে। শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এটি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অর্থনীতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে জ্বালানি সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। বড় বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও বোনাস নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বজায় রাখা সম্ভব হবে। বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের সমন্বয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা খাতে পুনর্ভর্তি ফি বাতিল করা হয়েছে। এতে লাখো শিক্ষার্থী উপকৃত হবে। ভর্তি পদ্ধতিতে পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ চলছে। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ই হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ শুরু হয়েছে। এতে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়েছে। এতে জনসচেতনতা বাড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নারীর নিরাপত্তায় বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে। সাইবার বুলিং প্রতিরোধেও কাজ চলছে। সরকারি ব্যয় কমাতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় উচ্ছেদ অভিযান চলছে। সমুদ্রসৈকত পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এতে পর্যটন খাত উপকৃত হবে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শহীদদের স্মরণে জাতীয় দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ খাতে অগ্রগতি হয়েছে। বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফ্রি ইন্টারনেট সেবার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রেনেও ইন্টারনেট চালুর কথা বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রথম মাস একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। সরকার দ্রুত কাজ শুরু করেছে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই কর্মতৎপরতা নতুন আশা তৈরি করেছে। এটি আস্থার একটি সূচনা। সামনে পথ দীর্ঘ। তবে প্রথম মাস দেখিয়েছে একটি বিষয়। এই সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এগোতে চায়। জনগণের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
লেখক : রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ক সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক।
