দুই মাসের নিষেধাজ্ঞায় জেলেদের আক্ষেপ

‘পানি দিয়া ইফতার আর পান্তা দিয়া করি সেহেরি’

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ২১:৪০

‘ভাই এই রমজানে হুদা মুড়ি আর পানি দিয়া করি ইফতার, পোঁড়া মইচ পান্তা ভাত দিয়া সেহেরি এই অইল আমগো জীবন। জিয়ে (মেয়ে) একটা তরমুজ খাইতে চাইছিলো, তরমুজ কিননের সামর্থ্যও আমার নাই। কিস্তির টেহা দিতে দিতে একবারে জীবন শেষ। এই গাংগো (নদীতে) ২ মাস সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাওনে রুজি-রোজগারের পথও বন্ধ। অন্য কোন কাম-কাইজও শিখি নাই, আমগো এলাকায় মাছের কাম ছাড়া অন্য কোন কামও নাই। ধার দেনা কইরা সাপ্তাহিক কিস্তির টেহা চালাইতাছি। পরের সপ্তাহর কিস্তির টেহা যি কেমতে চালামু হেই চিন্তায় রাইতে ঘুম আইয়েনা।’

এভাবেই আক্ষেপ করে কথাগুলো জানালেন চাঁদপুরের মেঘনা নদীর অভয়াশ্রম কেন্দ্রের শুরুর সেই মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল মালোপাড়া অঞ্চলের দরিদ্র জেলে শাহ জালাল (৬১)। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী আর চার সন্তানসহ সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে তার বসবাস। 

শাহ জালাল আরও বলেন, ‘আমি তিনটি এনজিও তিগা (থেকে) ঋণ উডাইয়া নৌকা আর জাল করছি। এক সমিতিরে প্রতি সপ্তায় ১৩শ' ৫০ টেহা (টাকা), আরেগটারে (আরেকটিকে) প্রতি সপ্তায় ১১শ' কইরা ২২শ' টেহা (টাকা) কিস্তি দিতে অয়। ২ মাসের লইগা আমগো গাংগো মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাওনে নদীতে জাল ফালাইতে পারতাছি না। কিন্তু কিস্তির তো নিষেধাজ্ঞা নাই ভাই। কিস্তি তো সময়মতো ঠিকই দেওন লাগদাছে। মা'ডা (মা) বয়স্ক মানুষ, রোগে শোগে ভুগতাছে। প্রত্যেক দিন অনেক টেহার অষুধ লাগে। সরকার আমগোরে চাউল দিলেও কন হেই চাউল খামু কি দিয়া? এই লগে তেল-নুন, ডাইল আর মাছ-তরকারি লাগে কিন্তু হেই টেহা পামু কই? খাওন-পিরন, অসুইক্কা (অসুস্থ) মার অসুধ পথ্য, হের উরপে আবার ৩ ডা সমিতির সাপ্তাহিক কিস্তি। কন, আমগো কি বাঁচনের কোন রাস্তা আছে? আমরা গরীব মানুষ, আমগো কষ্ট কেউ বোঝে না ভাই, কেউ বোঝে না।’ 

অন্যদিকে ষাটনল মালোপাড়ার ৪৩ বছর বয়সের রাজন তাঁতী শুনিয়েছেন দুই মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকাকালে তার করুণ জীবনের করুণ গল্প। ৬ সদস্যের পরিবারে সে একাই উপার্জনক্ষম। একেক একটি সমিতিকে প্রতি সপ্তাহে চড়া মূল্যের সুদসহ কিস্তি দিতে হলেও স্থানীয় গ্রুপিংয়ের কারণে জেলে কার্ড পাননি তিনি। এতে সরকারি খাদ্য সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন তিনি। 

একইভাবে ষাটনলে মেঘনা পাড়ের বাবু বাজার এলাকার জেলে জুয়েল প্রধান (৪৪) এর সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে অতি কষ্টে জীবন যাপন করছে। দুটি সমিতিকে প্রতি সপ্তাহে ১১শ’ ও ৮শ’ টাকা হারে কিস্তি পরিশোধ করতে হয় তাকে। এবং মেঘনা পাড়ের এখলাছপুর আশ্রয়ণ কেন্দ্রে বসবাস করা ৫ সদস্যের পরিবারের কর্তা সুমন ছৈয়াল (৫২) একটি সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা।

জেলেদের কয়েকজন বলেন, ‘ভাই আমগো দুঃখ কেউ বুঝে না। এই রমজান মাস, কি দিয়া সেহরি করি আর কি দিয়া ইফতার করি আল্লাহ মাবুদ ছাড়া কেউ জানে না।’

মেঘনা পাড়ের এখলাছপুর ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান ঢালী মুন্না জানান, সরকার ঘোষিত ২ মাসের নিষেধাজ্ঞার ৭০ কিলোমিটার অঞ্চলের ২৫ কিলোমিটার অঞ্চলই মতলব উত্তর উপজেলার মধ্যে। মেঘনা পাড়ের জেলেরা মাছ আহরণ ও বিক্রি করে দৈনিক নগদ অর্থ উপার্জনের কারণে তাদের বেশিরভাগরা জেলে এনজিও ঋণের উপর নির্ভরশীল। এই মেঘনা অঞ্চলের নদীতে দুই মাসের অভয়াশ্রমের সব ধরনের মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা বিপাকে পড়েন। 

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ২ মাস নদীতে সব ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে মৎস্য অধিদপ্তর। এই সময়ে চার কিস্তিতে ৪০ কেজি হারে খাদ্য সহায়তা হিসাবে সরকার চাল দিচ্ছে জেলেদের।

উপজেলা মৎস্যজীবী নেতা ফুলচান বর্মন জানান, মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধিতে আমরাও ভূমিকা রাখতে চাই। তাছাড়া জেলে তালিকা থেকে প্রকৃত জেলে নন এমন ব্যক্তিদের  বাদ দেওয়ার পাশাপাশি শুধু অভয়াশ্রম এলাকার জেলেদের সরকারি পর্যাপ্ত সুবিধা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাশ বলেন, উপজেলার ২ মাসের অভয়াশ্রম এলাকায় বেশকিছু অসাধু জেলে নিষেধাজ্ঞা না মেনে মাছ শিকারে নেমে পড়ে।

দীর্ঘ দিন ধরে একটি এনজিও সংস্থার ছেংগারচর ব্রাঞ্চের ম্যানেজারের দায়িত্বে আছেন জসিম উদ্দিন। জেলেদের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন,  জেলে পরিবারের ঋণগ্রহীতাদের কাছে আমাদের প্রতিনিধি যায় যারা কিস্তির টাকা দিতে পারে আমরা তাদের টাকা নিই। 

উপজেলা টাক্সফোর্স কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, মার্চ-এপ্রিল দু'মাস মাছের অভয়াশ্রম এলাকার জেলে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে কোনো এনজিও ঋণের কিস্তি না নেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পরিষ্কার নির্দেশনা রয়েছে।

ইত্তেফাক/এপি