একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রস্তাব

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৬, ১৯:১৭

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী ঘটনাবলিকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। গত ২০ মার্চ কংগ্রেস সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির কাছে বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।

উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে ভয়াবহ নিপীড়ন চালায়। এই দমন-পীড়নের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং অসংখ্য নারী ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হন। বিশেষ করে বাঙালি জনগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে চালানো এই অভিযানকে মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবে ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ওই রাত থেকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং বাঙালিদের দমন ও নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত। এই অভিযানের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়।

দলিল-প্রমাণ হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্রও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের পাঠানো ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’। ওই টেলিগ্রামে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মার্কিন সরকারের নীরবতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। এই বার্তাটি আন্তর্জাতিক মহলে তখন থেকেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এছাড়া, ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনকেও প্রস্তাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, কীভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে একটি পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালায়, যেখানে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে হত্যা করা হয়েছিল। এই প্রতিবেদনটি বিশ্ববাসীর সামনে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে নতুন করে তুলে ধরে।

প্রস্তাবে মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির একটি প্রতিবেদনও উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে তাদের সম্পদ ধ্বংস, নির্যাতন এবং হত্যার ঘটনা ঘটানো হয়।

নারী নির্যাতনের বিষয়টিও প্রস্তাবে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, যুদ্ধকালীন সময়ে দুই লাখেরও বেশি নারী পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধর্ষণের শিকার হন, যা এই সংঘাতের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করে তোলে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা ১৯৭১ সালের এই ঘটনাগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’, ‘যুদ্ধাপরাধ’ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একই সঙ্গে, এই অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবটি গৃহীত হলে তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্বীকৃতির দাবি আরও শক্তিশালী হবে এবং বিশ্বমঞ্চে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইত্তেফাক/কেএইচ