জামালপুর সদর উপজেলায় গরু চোর সন্দেহে এক যুবককে ধরতে গিয়ে না পেয়ে তার বাবা-মাকে তুলে নিয়ে সালিসে বৈঠকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। ওই ঘটনার অপমান ও নির্যাতন সইতে না পেরে জোসনা বানু নামে এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা যায়।
এছাড়াও বাবা সুরুজ আলী (৫৭), তোতা মিয়া (৪৭) ও সোহেল রানাকে (৩২) ইউনিয়ন পরিষদে আটক রেখেছেন স্থানীয় মেম্বার নায়েব আলী ও তার লোকজন। নিহত মধ্যবয়সী জোসনা বানু ওই এলাকার সুরুজ্জামানের স্ত্রী।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ভোরের দিকে উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের খলিলহাটা এলাকায় এ ঘটনায় ঘটে।
অভিযুক্ত নায়েব আলী মেম্বার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য।
গরু চোর সন্দেহে আটক সোহেল রানা ওই এলাকার রনজু মিয়া ছেলে ও তোতা মিয়া একই এলাকার সুরুজ্জামানের ছেলে। এছাড়াও ছেলে সুজন মিয়াকে (২৩) না পেয়ে বাবা সুরুজ আলীকে আটক করে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
খলিলহাটা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে নায়েব আলী মেম্বারের স্বজনের বাড়ির গোয়াল ঘরে শব্দ হয়। তাদের সন্দেহ হয় সুজন, তোতা মিয়া ও সোহেল রানা চুরি করতে এসেছে। এ খবর পেয়ে নায়েব আলী মেম্বার তার স্বজনের বাড়িতে আসেন। গরু চুরির চেষ্টার অভিযোগে প্রতিবেশী সুরুজ আলীর ছেলে সুজনকে বাড়ি থেকে ধরে আনতে যায়। এ সময় সুজনের মা ছেলে তুলে নিতে বাঁধা দেয়। তখন সুজনের মাকে মারধর করা হয়। পরে সুজন বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। ঘটনার জেরে নায়েব আলী মেম্বার ও তার লোকজন সুজনের বাবা সুরুজ আলীকে তুলে নিয়ে যায়। পরে ওই রাতেই তোতা মিয়াকে তুলে নিয়ে আসেন তারা। রাতে সালিস বৈঠকে সিদ্ধান্তে সুরজ আলী ও তোতা মিয়াকে নায়েব আলী মেম্বারের বাড়িতে আটকে রাখা হয়।
পরে সকালে নায়েব আলীর মেম্বারের বোনের বাড়িতে সালিশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সোহেলকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আসা হয়। সোহেল নায়েব আলী মেম্বারের বোনের বাড়িতে আসলে তাকে ওই দুইজনের (সুরজ আলী ও তোতা মিয়া) মাঝখানে বসতে বলা হয়। এসময় সোহেল তাদের মাঝখানে বসতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে তাদের তিনজনকে একসঙ্গে বেঁধে গণপিটুনি দেন স্থানীয়রা। একপর্যায়ে সুজনের মা জোসনা বেগমকেও ডেকে নিয়ে এসে চুল টেনে কিল-ঘুষি ও মারধর শুরু করেন। এ সময় নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দৌড়ে বাড়িতে পালিয়ে যায় জোসনা বেগম। পরে বাড়িতে গেলে জোসনা বেগমের ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পায় স্থানীয়রা।
এরপর মেম্বার নায়েব আলী ও গ্রাম পুলিশরা আটক তিনজনকে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আটকে রাখেন
স্থানীয় বাসিন্দা আক্তার আলি বলেন ‘চুরির অভিযোগে ছেলেকে না পেয়ে মা-বাবাকে ধরে এনে মারধর করা হয়। অপমান সইতে না পেরে ওই নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
সালিশে আহত জিরাতন বেগম নামে একজন বলেন ‘আমার সন্তান ঘরে শুয়ে আছিলো। ঘর থেকে গ্রামের মানুষ ধরে নিয়ে গেছে। তার সাথে সাথে আমিও গেছি। আমারে ও মারছে,আমি মার খেয়ে ওখানে পরে গেছিলাম। ওরাই আমাকে আবার পানি দিছে । আমার পোলা ভালো মানুষ। কেনো মারলো আমি এর বিচার চাই।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য নায়েব আলী বলেন, ‘প্রতিবেশীর অভিযোগের ভিত্তিতে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেন। অভিযুক্তদের ডাকা হলে সোহেল রানা উপস্থিত হয়নি। এ সময় তার পরিবারের সদস্যরা খারাপ আচরণ করলে কিছু লোক উত্তেজিত হয়ে সামান্য মারধর করে। আমি তাদের থামানোর চেষ্টা করেছি। পরে শুনেছি, তার মা মারা গেছেন।’
এ ঘটনায় জামালপুর থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘জরুরি সেবায় ৯৯৯ ফোন পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। এখনো কোনো পক্ষের অভিযোগ পাওয়া যাইনি। অভিযোগ পেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

