‘বেটাই দিবে হামাক মাটি, আজকে হামাক দেওয়া নাকছে বেটাক মাটি। হামার বউ ছোল সগি গেল, পাঁচদিন আগোত ব্যাটাক বিয়া করাচি, ব্যাটার শাশুড়িও মরি গেল। একসাতে সগলে মরলো।’
শনিবার (২৭ মার্চ) সকালে এভাবেই প্রলাপ বকতে বকতে প্রতিবেশীদের কাঁধে ভর করে ছেলে ও স্ত্রী জানাজায় অংশ নেন রাজমিস্ত্রি মো. হামিদুজ্জামান। এ সময় তার আত্মীয়-স্বজনরা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
হামিদুজ্জামান টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত গাইবান্ধার নিজপাড়া গ্রামের নার্গিস বেগমের স্বামী রাজমিস্ত্রি মো. হামিদুজ্জামান। এই ঘটনায় তার ১১ বছরের শিশু নীরব মিয়া ও বড় ছেলের শাশুড়ি দোলা বেগমও (৩৫) প্রাণ হারান।
গত শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে গাইবান্ধার নিজপাড়া গ্রামের মা ও ছেলে সহ পাঁচ জন নিহত হয়। শনিবার সকাল ৮টায় পাঁচটি মরদেহ নিজপাড়া গ্রামে পৌছলে শুরু হয় শোকের মাতম। গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে নিজপাড়া নামে ওই ছোট গ্রামটি স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে।
শনিবার সকালে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামজুড়ে চলছে শোকের মাতম। নিহতদের বাড়িতে চলছে কান্না ও আত্মীয় স্বজনদের আহাজারি। আশপাশের লোকজন নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
হামিদুজ্জামানের পারিবারিক সূত্র জানায়, হামিদুজ্জামান রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। স্ত্রী নার্গিস বেগম পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। এই দম্পতির বড় ছেলে নাঈম মিয়ার সঙ্গে গত পাঁচ দিন আগে বিয়ে হয় পোশাক শ্রমিক নিহত দোলা বেগমের মেয়ে জুই মনির । নতুন দম্পতিকে এলাকায় রেখে দুই বিয়ান নার্গিস বেগম ও দোলা বেগম পোশাক কারখানায় কাজে যোগ দিতে একসঙ্গে বাসযোগে ঢাকা রওনা হন । কিন্তু তাদের এই আনন্দযাত্রা পরিণত হয় আর বিষাদময় ঘটনায়।
ওই গ্রামের বাসিন্দা ধাপেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমিনুর রহমান মিলন বলেন, এই ঘটনার পর ঈদ ও বিয়ের আনন্দময় গ্রামটিতে নেমে আসে শোকের ছায়া।
এদিকে একই গ্রামের নিহত রিপা বেগমের বাড়িতে চলছিল আহাজারি। নিহত রিপার বাবা আবদুর রশিদ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলছিলেন, আমি কৃষক মানুষ। কোনমতে সংসার চলে। আমার মেয়ে রিপার বিয়ে হয়নি। সে চারবছর ধরে পোশাক কারখানায় চাকরি করছে। টাকা উপার্জন করবে। আশা ছিল, কিছুদিন পর মেয়েকে বিয়ে দেবো। সব আশা মাটি হয়ে গেল। আমরা এর বিচার চাই।
এ সময় রিপার মা বিলকিস বেগম নির্বাক দৃষ্টিতে বসেছিলেন। রিপার পারিবারিক সূত্র জানায়, চার বছর ধরে টাঙ্গাইলের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। রিপার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বড় ভাই একটি বিদ্যুৎ একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। ছোট দুই ভাই সবুজ (৮) ওমর (৬)।
নিজপাড়া গ্রামের আরেক নিহত সুলতান মিয়ার বাড়িতেও চলছে চলছিল আহাজারি। তার পিতা আজিজুর রহমান ও মা শাহানা বেগম পাশাপাশি বসে কান্নাকাটি করছিলেন। তার মা শাহানা বেগম কান্না জড়িত কণ্ঠে বললেন, আমি ছেলেটাকে বলেছিলাম এলাকাতে কাজ কর, চাকরি করতে নিষেধ করেছিলাম। চাকরি করতে না গেলে আমার ছেলেটা মরতো না।
ঘরের পাশে আঙিনায় মুখে কাপড় দিয়ে কান্নাকাটি করছিল নিহত সুলতানের স্ত্রী শামসুন্নাহার। কান্না জড়িত কণ্ঠে শামসুন্নাহার বললেন, ‘হামার ছোলটা কেমন করে মরল, তোমরা হামার ছাওয়াক আনি দাও।’
সুলতানের বাবা আজিজুর রহমান বললেন, আমার ছেলেটা চাকরি করে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতো। সেই টাকায় আমাদের সংসার চলতো। এখন কে টাকা পাঠাবে। নিহত সুলতানের তিন বছরের মেয়ে নাজিফা শুধু বাবাকে খুঁজছে।
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ধলাটেংগর এলাকায় পৌঁছালে বাসটির তেল ফুরিয়ে যায়। তখন বাসটি মহাসড়কের পাশে থেমে যায়। এসময় বাসের কয়েকজন যাত্রী নিচে নেমে পাশের রেললাইনে বসেছিলেন। ঠিক তখনই উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন তাদের ধাক্কা দেয়। এতে ট্রেনে কাটা পড়ে একই পরিবারের মা-ছেলে সহ পাঁচজন নিহত হন।
নিহতরা হলেন, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের নিজপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি মো. হামিদুজ্জামান ওরফে হাম্বুর স্ত্রী নার্গিস বেগম (৩৫), তার ছেলে নীরব মিয়া (১১), আজিজার রহমানের ছেলে সুলতান মিয়া (৩০), আবদুর রশিদের মেয়ে রিপা খাতুন (২০) ও পার্শ্ববর্তী ছত্রগাছা গ্রামের জাকির হোসেনের স্ত্রী ও হামিদুজ্জমানের ছেলের শাশুড়ি (বিয়ান) দোলা বেগম (৩৫)। নিহতদের মধ্যে শিশুটি বাদে সবাই পোশাক শ্রমিক ছিলেন।
