পরিবর্তনশীল বাজারে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য: নিলামই সমাধান  

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১১:১৬

আমার প্রতিষ্ঠান কাজী ফার্মস বাংলাদেশে ব্রয়লার মুরগির অন্যতম বৃহৎ উৎপাদক। আমাদের গাজীপুর অফিস থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫,০০০ জীবিত ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়। আমরা যখন মুরগি বিক্রি শুরু করি, তখন একটি বড় সমস্যা ছিল কীভাবে এর মূল্য নির্ধারণ করা হবে। মুরগির বাজারমূল্য প্রতিদিন পরিবর্তিন হয়,কারণ সরবরাহ ও চাহিদা উভয়ই পরিবর্তনশীল। হাজার হাজার খামারির কাছ থেকে আসা মুরগির সরবরাহ স্থির নয়; আবহাওয়া ও রোগবালাই প্রায়ই পোলট্রি খামারের উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে। ভোক্তাদের মুরগির চাহিদাও পরিবর্তিত হয়, কারণ মাছ ও ডিমের মতো বিকল্প খাদ্যের দামে মৌসুমি পরিবর্তন ঘটে। জীবিত ব্রয়লার মুরগি নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো পণ্য, তাই বাজারে আনা পরিমাণ যেন বিক্রি হয়ে যায় তা নিশ্চিত করতে আমাদের প্রতিদিন মূল্য সংশোধন করতে হয়।

আমরা প্রতিদিনের মূল্য নির্ধারণের এই সমস্যার সমাধান করেছি আমাদের ব্রয়লার মুরগির অনলাইন নিলামের মাধ্যমে। নিলাম হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে প্রতিযোগী ক্রেতারা দর প্রস্তাব করে এবং সেই দর থেকেই মূল্য নির্ধারিত হয়। আমাদের ব্রয়লার নিলামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো আমরা কখনো সর্বোচ্চ দরদাতার দামে বিক্রি করি না। প্রতিদিন আমাদের অনেক ক্রেতার কাছে অনেক মুরগি বিক্রি করতে হয়। তাই এমন একটি দর বেছে নিতে হয় যা তুলনামূলকভাবে কম, যাতে সেদিন যারা কিনবে তারা সবাই সন্তুষ্ট থাকে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির কোন এক সকালে আমাদের গাজীপুর সেলস অফিসের ম্যানেজার খামারগুলো থেকে জানতে পারেন যে ১৫,০০০ ব্রয়লার মুরগি বিক্রির জন্য প্রস্তুত। এরপর সেলস অফিসের ম্যানেজার গাজীপুর এলাকার বিভিন্ন পাইকারি ক্রেতাকে আমাদের স্মার্টফোন নিলাম অ্যাপের মাধ্যমে তাদের মূল্য ও পরিমাণ উল্লেখ করে দর জমা দিতে অনুরোধ করেন। কাজী ফার্মস দেশের মোট ব্রয়লার মুরগির উৎপাদনের মাত্র প্রায় ৪% উৎপাদন করে। তাই আমাদের পাইকারি ক্রেতারা অন্য মুরগি উৎপাদকদের কাছ থেকেও নিয়মিত মুরগি কিনে থাকে। যেহেতু বাজার প্রতিযোগিতামূলক, তাই আমাদের নিলামে অংশ নেওয়া পাইকাররা সাধারণত সেই দরই দেয় যা অন্য খামারিদের কাছ থেকে তারা যে দামে কিনতে পারে তার কাছাকাছি। প্রত্যেক পাইকারের বিকল্প উৎস ভিন্ন হওয়ায় তারা সাধারণত ভিন্ন ভিন্ন দর প্রস্তাব করে।

আমাদের ক্রেতারা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১,২৫০টি ব্রয়লার মুরগি কেনে। অর্থাৎ আমাদের ১৫,০০০ মুরগি বিক্রি করতে সাধারণত প্রায় ১২ জন ক্রেতার প্রয়োজন হয়। আমরা সব ক্রেতাকে তাদের দেওয়া সর্বোচ্চ দর থেকে সর্বনিম্ন দর পর্যন্ত সাজাই এবং তাদের প্রস্তাবিত পরিমাণ যোগ করতে থাকি যতক্ষণ না আমাদের সব মুরগি বিক্রি হয়ে যায়। ফলে গড় হিসাবে আমরা সব মুরগি বিক্রি করি দ্বাদশ সর্বোচ্চ দরদাতার প্রস্তাবিত মূল্যে।

যখন একটি গাড়ি বা একটি চিত্রকর্ম নিলামে তোলা হয়, তখন মাত্র একজন ক্রেতাই প্রয়োজন হয় এবং সেটি সর্বোচ্চ দরদাতার কাছেই বিক্রি করা হয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে আমরা হাজার হাজার মুরগি বিক্রি করি, এবং প্রতিটি ক্রেতা আমাদের মোট পরিমাণের প্রায় ১২ ভাগের একভাগ কিনতে চায়। তাই এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করতে হয় যা পুরো পরিমাণ কিনতে প্রয়োজনীয় ১২ জন দরদাতার কাছে গ্রহণযোগ্য। কার্যকর নিলামমূল্য তাই দ্বাদশ সর্বোচ্চ দর। একই দিনে একজন ক্রেতার নিকট বেশি দামে এবং আরেকজনের নিকট কম দামে বিক্রি করা বাস্তবসম্মত নয়। সব ক্রেতাই আমাদের সেলস অফিসে এসে তাদের মুরগি সংগ্রহ করে এবং কাউকে যদি বেশি দাম দিতে বলা হয় তবে সে স্বাভাবিকভাবেই অসন্তুষ্ট হবে। তাই একই দিনে যারা মুরগি ক্রয় করে তারা সবাই একই মূল্যে পায়। নিলাম প্রক্রিয়ায় এই বিষয়টি নিশ্চিত করে মূল্য নির্ধারণ করা হয় দ্বাদশ সর্বোচ্চ দর অনুযায়ী, যে দামে ঐ দিনের বিক্রয়যোগ্য সমস্ত মুরগি বিক্রি হয়ে যায়। এর ফলে ক্রেতারা সন্তুষ্ট থাকে এবং পরের দিন তারা আবার স্বাচ্ছ্যন্দে নিলামে অংশ নিতে পারে।

কাজী ফার্মসের ডিম ও মুরগি বিক্রির পুরো ব্যবস্থাটি এক ধরনের ভিকরি-ক্লার্ক-গ্রোভস নিলাম, যা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ভিকরির নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই ধরনের নিলামে একাধিক ক্রেতার কাছ থেকে একাধিক দর গ্রহণ করা হয় যতক্ষণ না বিক্রয়ের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ শেষ হয়ে যায়। (https://en.wikipedia.org/wiki/Vickrey-Clarke-Groves_auction)

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিলামকে পরিবর্তনশীল মূল্যের পণ্য বিক্রির সবচেয়ে ন্যায্য ও স্বচ্ছ পদ্ধতিগুলোর একটি হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
দুঃখজনকভাবে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার মধ্যে নিলাম সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়ার অভাব দেখা গেছে। ২০২৩ সালে প্রতিযোগিতা কমিশন ব্রয়লার মুরগির দাম বেশি নির্ধারণ করার অভিযোগে কাজী ফার্মসকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করেছিল (যদিও পরে আদালত সেই জরিমানা স্থগিত করেন)। প্রথমত, একটি কোম্পানি যদি দেশের মোট সরবরাহের মাত্র ৪% নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে তাকে মূল্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা অযৌক্তিক। 
দ্বিতীয়ত, আমরা যখন নিয়মিত দ্বাদশ সর্বোচ্চ দর অনুযায়ী বিক্রি করি, তখন কাজী ফার্মসের দাম কীভাবে অযৌক্তিকভাবে বেশি ছিল তা বোঝা কঠিন। তৃতীয়ত, সে সময় প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্যরা সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে আমাদের নিলাম প্রক্রিয়া তাদের কাছে “অদ্ভুত” মনে হয়েছে, কারণ আমাদের বিক্রয়মূল্য ক্রেতাদের প্রস্তাবিত সর্বোচ্চ দর মূল্য ছিল না। তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে আমাদের নিলাম প্রক্রিয়ায় কারসাজি রয়েছে। কিন্তু সব ভিকরি-ধরনের নিলামের বৈশিষ্ট্যই হলো এটি সর্বোচ্চ দর মূল্য নির্ধারণ করে না। নিলাম সম্পর্কে এই মৌলিক বোঝাপড়ার অভাব স্পষ্টভাবে দেখায় যে প্রতিযোগিতা কমিশনের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থার সদস্যদের অর্থনীতিতে ডিগ্রি থাকা জরুরি। অন্যথায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক ভিত্তি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে পোলট্রি শিল্পের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশন যে অন্যায্য মামলাগুলো করেছে তা প্রত্যাহার করা উচিত।

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে এখনো লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে, তাই খাদ্যের মূল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে কৃষিপণ্য ন্যায্য দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো একক পদ্ধতি নিয়ে সাধারণ বোঝাপড়া তৈরি হয়নি যা ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারে। উপরোক্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে যৌক্তিক পথ হলো সরকার যেন নিশ্চিত করে যে নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো কৃষিপণ্যের সব বড় উৎপাদক প্রতিদিন নিলাম পদ্ধতি চালু করে। যাতে সরকারি সংস্থাগুলো নিলামের রেকর্ড যাচাই করে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারে। অবশ্যই এর জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের নিলামের অর্থনৈতিক তত্ত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে।

লেখক: কাজী ফার্মস লিমিটেড - এর পরিচালক

ইতেফাক/এএইচপি