রাজশাহীর তানোর

ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেকেই ফিরলেন তেল না পেয়ে

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ২১:৫১

কারো হাতে বোতল, কেউ এনেছেন গ্যালন। রাজশাহীর তানোরে এভাবে তেলের অপেক্ষায় ভোর থেকে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে কৃষকদের। কিন্তু ভোরের পর সকাল গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেকেই পাননি তেল। এতে হতাশ হয়ে ফিরেছেন কেউ কেউ। 

সাম্প্রতিক সময়ে সরেজমিনে এমনটাই দেখা গেছে এই উপজেলার পাম্পে। এসময় কথা হয় কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে। তারা জানান, দ্রুত তেল পাওয়ার আশায় ভোরেই এসেছেন অনেকেই। তবুও অনেকেই তেল পাননি। আবার অনেকেই তেল পেয়েছেন চাহিদার তুলনায় কম।

কৃষকরা জানান, তানোর উপজেলা মূলত কৃষিভিত্তিক এলাকা। যেখানে বর্তমানে পুরো দমে চলছে আলু উত্তোলন স্টোরজাতকরণ ও বোরো চাষ ও ধান রোপন। এসব কৃষি কাজে ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রের তেল পেতে কৃষকরা ছুটছেন এই পাম্প থেকে ওই পাম্পে। যখন যে পাম্পে তেল দেওয়ার খবর পাচ্ছেন সেই পাম্পে ছুটছেন কৃষকসহ মটরসাইকেলসহ চালকরা। তেল দেওয়া শুরুর আগেই ভোর থেকে পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল ও ভটভটিসহ তেলের পাত্র হাতে কৃষকদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ছে। তেল পেতে তর্ক-বিতর্কের পাশাপাশি হুড়োহুড়ি ও ঠেলাঠেলিসহ ঘটছে ছোট খাট মারামারির ঘটনাও।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে তেল সংকটের আশঙ্কায় সারাদেশের মতো তানোরের কৃষকসহ জ্বালানি তেলের ব্যবহারকারীরা তেল সংগ্রহ করে অনেকেই মজুদ করতে শুরু করেন। ফলে, পাম্পগুলো গ্রাহকদের চাহিদামত জ্বালানি তেল সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছেন। যে পাম্পগুলো এক গাড়ি তেল বিক্রি করতেন ১০ দিন থেকে ১৫ দিনে সেই পাম্পগুলোতে তেল আসার দিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে তেল। তেলের সরবরাহের তুলনায় চাহিদা মেটাতে পাম্পগুলো ২শ’ টাকা থেকে ৩শ’ বা ৫শ’ টাকা পর্যন্ত তেল দিচ্ছেন।

গত রোববার (৩০ মার্চ) দুপুরে তানোরের মুন্ডুমালা পৌর এলাকা মেসার্স বিশ্বাস ফিলিং স্টেশনে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলে ৩শ’ টাকার করে পেট্রোল দেওয়া হলেও অকটেন নেই। অপর দিকে ভটভটি (বিশেষ গাড়ি) ও ট্রলির দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি পাওয়ার থ্রিলার ও কৃষিযন্ত্রের পাত্রেরও দীর্ঘ লাইনে রেখেছেন কৃষকরা। ডিজেল দেওয়া হচ্ছে ৫শ’ টাকার করে। এভাবে চলতে থাকা অবস্থায় বিকাল ৩টার সময় তেল শেষ হয়েও গেলেও লাইনে তেল নিতে অপেক্ষায় শতাধিক মোটরসাইকেল-ভটভটিচালক এবং অন্তত অর্ধশত কৃষক।

তানোর উপজেলার কলমা ইউপির বিল্লি গ্রাম থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের মুন্ডমালায় ‘বিশ্বাস ফিলিং স্টেশনের’ তেলের জারকিন হাতে এসেছেন আব্দুস সামাদ নামের এক কৃষক। বিকেল ৩টার সময় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, তেল দেওয়ার খবর শুনে সকাল ৬টার সময় পাম্পে এসেছি; এখন পর্যন্ত তেলে পাইনি। তিনি বলেন, তার আগেও শত শত কৃষক জারকিন হাতে লাইনে দাড়িয়ে আছেন। তিনি আরও বলেন, জমিতে চাষের ট্রাক্টর ও ট্রলির জন্য তেল না পেলে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যাবে। তার সামনে অর্ধশতাধিক জারকিনের সারি দেখা গেছে।

হঠাৎ তেল শেষ হওয়ার খবরে উত্তেজিত হয়ে পড়েন দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে তেলের জন্য অপেক্ষা করা শতাধিক মোটরসাইকেলের চালক। এসময় সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রাতে আগে থেকেই দায়িত্ব পুলিশ সদস্যদের উপর চড়াও হতেও দেখা গেছে। এক পর্যায়ে তেলের ট্যাংক পরীক্ষা করার পর ফিরে যান মটরসাইকেলসহ চালকরা। এর কিছু পরেই শেষ হয়ে যায় ডিজেল। এসময় অর্ধশতাধিক কৃষক ফিরে যান তেল ছাড়াই খালি পাত্র হাতে। এসময় কৃষকদের চোখে মুখে দেখা গেছে হতাশার ছাপ।

বাধাইড় ইউপির খাড়ি কল্যা থেকে এসেছেন বাবুল হোসেন তিনি বলেন, আলু  উত্তোলনের পর স্টোরজাত করতে ট্রলির জন্য এবং বোরো রোপণে জমিতে চাষের জন্য ট্রাক্টরের তেল শেষ হয়ে গেছে। সকাল ৭টায় এসেছি সকাল ৮টা থেকে তেল দেওয়া শুরু হয়েছে এখন বিকেল ৩টা। এখনও তেল পাইনি।

‘মুন্ডমালা বিশ্বাস ফিলিং স্টেশনের’ মালিক খাইরুল ইসলাম বলেন, আমরা আগে গাড়িভর্তি তেল পেতাম এখন সপ্তাহে একদিন বা দুইদিন তেল পাচ্ছি যার পরিমাণও আগের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ। সকাল ৮টা থেকে কৃষকদের ৫শ’  টাকার করে ডিজেল তেল দেওয়া হচ্ছে যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

তিনি আরও বলেন, তেল দেওয়ার খবর রাত থেকেই শত শত কৃষক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন তাদের কৃষিযন্ত্রের তেলের জন্য। দীর্ঘ সময় লাইনে দাড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন শত শত কৃষক। কৃষকদের জন্য তেলের বরাদ্দ বাড়ানো উচিত।

তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, কৃষকদের ভোগান্তি দূর করতে আমরা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রেখে তেলের বরাদ্দ বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এখন পুরোদমে কৃষকরা আলু উত্তোলন ও পরিবহনের পাশাপাশি বোরো রোপণের কাজ করছেন। এ কারণে তেলের জন্য কৃষকরা পাম্পে ভিড় করছেন। আশা করছি বরাদ্দ বাড়ানো হবে। আরও ১০/১৫ দিন লাগবে আলু উত্তোলন পরিবহন ও বোরো রোপণের জন্য।

তিনি আরও বলেন, তেল সংকটে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে। তবে, কৃষকদের ভোগান্তিতে রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাঈমা খান বলেন, কৃষি প্রধান তানোর উপজেলার কৃষকদের কৃষিযন্ত্রের তেলের বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য ডিসি স্যারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রতিনিয়তই যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং ডিজেলের বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য চাহিদা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি বরাদ্দ বাড়ানো হবে। কৃষকদেরকে সঠিকভাবে তেল সরবরাহের জন্য উপজেলার চারটি পাম্পেরই মালিকদের নির্দেশনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ইত্তেফাক/এপি