তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া একটি চিঠিকে ঘিরে এই আলোচনা আবারও জোরালো হয়েছে। চিঠিটিতে ই-সিগারেট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে আন্তর্জাতিক বাস্তবতা সম্পর্কে কিছু বিভ্রান্তিকর ও অসম্পূর্ণ তথ্যও উঠে এসেছে, যা বিভিন্ন দেশে ই-সিগারেট কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে—সেই চিত্রটি সঠিকভাবে তুলে ধরে না।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে- সমাধান কি সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞায়, নাকি বাস্তবভিত্তিক নিয়ন্ত্রণে? এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু আবেগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রমাণভিত্তিক তথ্যের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ বেশ কয়েকটি দেশ ই-সিগারেট সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে, এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রকৃতপক্ষে, অধিকাংশ উন্নত দেশে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ নয়; বরং নির্দিষ্ট নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ই-সিগারেটের ওপর তদারকি করে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA)। কোনো পণ্য বাজারে আসার আগে কঠোর প্রি-মার্কেট অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিছু নির্দিষ্ট ফ্লেভার সীমিত করা হলেও, নিয়ম মেনে চলা কিছু পণ্য বাজারে থাকার অনুমতি পায়। একইসাথে এফডিএ উল্লেখ করেছে, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ই-সিগারেট প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করতে পারে, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে ভিন্নধর্মী পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। দেশটির ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) ই-সিগারেটকে ধূমপান ছাড়ার একটি সহায়ক উপায় হিসেবে বিবেচনা করে। একইসঙ্গে পরিবেশগত কারণে একবার ব্যবহারযোগ্য বা ডিসপোজেবল পণ্যের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। তবে এটিও একটি নির্দিষ্ট সমস্যাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, সার্বিক নিষেধাজ্ঞা নয়।
ফ্রান্সেও একই ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়। সেখানে ডিসপোজেবল ই-সিগারেটের ব্যবহার সীমিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে পরিবেশগত প্রভাবের কথা বিবেচনা করে। দেশটির জনস্বাস্থ্য সংস্থা এএনইএস জানিয়েছে, ধূমপানের তুলনায় ভ্যাপিং কম ক্ষতিকর এবং এটি ধূমপায়ীদের জন্য একটি বিকল্প হতে পারে। ইতালির ক্ষেত্রেও একইভাবে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নেই; বরং নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা বিকল্প পণ্যের একটি বড় রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে বিকল্প নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার অনুমোদন দিয়েছে। এসব দেশে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধূমপান কমানো এবং জনস্বাস্থ্য উন্নত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবে সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রিত বিকল্প পণ্য ব্যবহার অনেক ধূমপায়ীকে প্রচলিত তামাক থেকে দূরে সরাতে সাহায্য করেছে।
একই সময়ে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ই-সিগারেট সংক্রান্ত কিছু বর্ণনা বা প্রচারণার উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে বহিরাগত অর্থায়নে পরিচালিত সংস্থা ও উদ্যোগের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেমন ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রোপিস। পাকিস্তান ও ফিলিপাইনে এ ধরনের প্রভাব আইন প্রয়োগ ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলছে কি না এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় নীতির স্বায়ত্তশাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশেও নীতিনির্ধারণের আলোচনায় এমন কিছু দাবি সামনে এসেছে, যেখানে বিশ্বব্যাপী নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তীতে এসব তথ্যের অনেকটাই অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর হিসেবে স্পষ্ট হয়েছে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা দেখায়, আন্তর্জাতিক উদাহরণ ব্যবহারের আগে সেগুলো ভালোভাবে যাচাই করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ই-সিগারেট ও প্রচলিত তামাকের মধ্যে পার্থক্য। বিশ্বের অনেক জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ই-সিগারেটকে আলাদা একটি শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করে এবং এটি ক্ষতি হ্রাসের (হার্ম রিডাকশন) কৌশলের অংশ হিসেবে দেখে। এই কারণে অনেক দেশে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে একদিকে ক্ষতি কমানো যায়, অন্যদিকে তরুণদের মধ্যে অপব্যবহার রোধ করা যায়।
নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণ এই দুই পদ্ধতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তাদের আচরণে ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলে, যা অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ায় কঠোর নিয়ন্ত্রণের অভাবে অবৈধ বাজারের প্রসার এবং কর ফাঁকির মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো কাঠামোবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনস্বাস্থ্য ও বাস্তবায়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এসব উদাহরণ দেখায়, কার্যকর নীতি প্রণয়নের জন্য শুধু উদ্দেশ্য নয়, বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে তামাক নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু, সেখানে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। তবে সেই শিক্ষা হতে হবে সঠিক ও যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ, তথ্যনির্ভর ও বাস্তবসম্মত নীতিই পারে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে।
লেখক: আইনজীবী, ঢাকা জজকোর্ট
