প্রবাহের উদ্যোগে নিরাপদ পানি, বদলে যাচ্ছে প্রান্তিক জনজীবন

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৫৯

কুষ্টিয়ার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে থাকেন ফাতেমা বেগম। একসময় প্রতিদিন ভোরে তাকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে হতো খাবার পানি সংগ্রহের জন্য। দূরের নদী বা অন্য কোনো উৎস থেকে পানি আনাই ছিল তার দিনের শুরু। এরপর সেই অনিরাপদ পানি কাঠের চুলায় ফুটিয়ে পানযোগ্য করতে হতো, ফলে বাড়তি খরচের পাশাপাশি ভোগান্তিও বেড়ে যেত।
 
‘আগে পানি আনতে গিয়ে কখনো পা কেটে যেত, কখনো পিঠের ব্যথা অসহ্য হয়ে উঠত। আমার শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ত। গর্ভবতী থাকতে বারবার ভয়ে কাঁপতাম—ভাবতাম, এমন অনিরাপদ পানি আমার আর শিশুর জন্য কতটা বিপজ্জনক,’ বলেন ফাতেমা।

এই গল্প শুধু ফাতেমার নয়। কুষ্টিয়ার অসংখ্য গ্রামের অগণিত নারীর প্রতিদিনের জীবনের গল্পও এমনই। তবে এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। প্রবাহ উদ্যোগের আওতায় গ্রামের কাছেই স্থাপিত হয়েছে পানি শোধনাগার, যা স্থানীয় মানুষের জন্য নিরাপদ পানির একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে গড়ে উঠেছে।
 
ফাতেমা বলেন, ‘এখন আমাদের গ্রামে নিরাপদ পানি আছে। পানির জন্য আর মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয় না। প্রবাহের কারণেই জীবন এখন অনেক সহজ আর স্বস্তির।’

যেভাবে শুরু প্রবাহের গল্প
বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির সংকট বরাবরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর যৌথ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি (JMP)-এর তথ্যমতে, ২০১৫ সালে যেখানে মাত্র ৫৬ শতাংশ মানুষের নিরাপদ পানির নাগাল ছিল, বর্তমানে সেই হার সামান্য বেড়ে ৫৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া এবং প্রায় ৬০টি জেলায় ছড়িয়ে থাকা আর্সেনিক দূষণ এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।

নিরাপদ পানীয় জলের সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন প্রান্তিক জনপদের সাধারণ মানুষ। এই বাস্তবতা মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ কাজ করে চলেছে, যার মধ্যে ‘প্রবাহ’ একটি উল্লেখযোগ্য ও কার্যকর উদ্যোগ। কুষ্টিয়া ও মানিকগঞ্জের কৃষক সম্প্রদায়ের নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে ২০০৯ সালে ‘প্রবাহ’-এর যাত্রা শুরু হয়।

নিরাপদ পানির ঘাটতি নিরসনে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পানি পরিশোধন প্লান্ট স্থাপন করা হয়। এর ফলে কৃষক পরিবারগুলো পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি থেকে অনেকটাই সুরক্ষা পাচ্ছে, কমেছে চিকিৎসা ব্যয় এবং সময়ের অপচয়। সুস্থ জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়াও নিশ্চিত হচ্ছে, যা একটি সুস্থ ও সম্ভাবনাময় প্রজন্ম গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।

সময়ের সঙ্গে পাহাড়ি দুর্গম এলাকাতেও পৌঁছে গেছে ‘প্রবাহ’। আগে সুপেয় পানির জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সংকট তীব্র হতো। এখন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় উৎস থেকে পানি শোধন করে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাহাড়ের পর উপকূলীয় নোনা পানির সংকট মোকাবিলায়ও কাজ করছে ‘প্রবাহ’। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট লবণাক্ততা দূর করতে স্থাপিত শোধনাগারগুলো নোনা পানিকে সুপেয় পানিতে রূপান্তর করে স্থানীয় মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য খাবার পানির উৎস তৈরি করেছে।

প্রযুক্তিনির্ভর পানি শোধনাগার, স্থানীয় কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে গত ১৭ বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদ পানির সুবিধা পৌঁছে দিয়েছে ‘প্রবাহ’। ফলে প্রান্তিক অঞ্চলের লাখো সাধারণ মানুষ নিরাপদ পানি ব্যবহার করে গৃহস্থালি ও সন্তানদের খাবার পানি নিশ্চিত করতে পারছেন, পানিবাহিত রোগ ও চর্মরোগের ঝুঁকি কমে জীবনযাত্রা অনেক সহজ ও স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছে। 

কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ
বর্তমানে দেশের ২৫টি জেলায় ১২০টি পানি শোধনাগার পরিচালনা করছে ‘প্রবাহ’, যার সুফল পাচ্ছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ। কুষ্টিয়া ও মানিকগঞ্জের আর্সেনিকপ্রবণ সমতল থেকে শুরু করে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড় কিংবা সাতক্ষীরার উপকূল—প্রতিটি অঞ্চলের সংকটের ধরণ বুঝে আলাদা আলাদা সমাধান নিয়ে কাজ করছে এই উদ্যোগ।

শোধনাগারগুলোতে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী। কোথাও আর্সেনিক দূর করতে উন্নত ফিল্টার, কোথাও উপকূলের লোনা পানি সুপেয় করার বিশেষ প্রক্রিয়া, আবার কোথাও পাহাড়ের ঝরনা বা ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে পানি শোধনের ব্যবস্থা। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে; উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস, টাইফয়েড ও কলেরার মতো পানিবাহিত রোগের প্রকোপ।
 
তবে শুধু প্রযুক্তি নয়, ‘প্রবাহ’-এর বিশেষত্ব হলো এর টেকসই পরিচালনা পদ্ধতি। স্থানীয়দের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে শোধনাগার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে এই উদ্যোগকে সরাসরি কমিউনিটির মালিকানাধীন একটি স্থায়ী উদ্যোগে রূপান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে একটি আধুনিক কল সেন্টার, যেখানে স্থানীয় মানুষ যেকোনো সমস্যার কথা দ্রুত জানাতে পারেন। এই নিরবচ্ছিন্ন তদারকি আর জনঅংশগ্রহণের ফলেই গত ১৭ বছর ধরে মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘প্রবাহ’।

স্বীকৃতি
আর্সেনিক দূষণ, পাহাড়ি অঞ্চলে পানির সংকট এবং উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততাজনিত পানির সমস্যার সমাধানে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘প্রবাহ’ ২০১৫ সালে এন্টারপ্রাইজ এশিয়া কর্তৃক প্রদত্ত মর্যাদাপূর্ণ এশিয়া রেসপনসিবল এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যাওয়ার্ড (এআরইএ) এবং ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফোরাম কর্তৃক প্রদত্ত বাংলাদেশ ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে।

প্রবাহের প্রতিনিধি আহমেদ রায়হান আহসানউল্লাহ বলেন, “বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কিভাবে কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন অংশীদারের সহযোগিতায় টেকসই সমাধান গড়ে তোলা সম্ভব, ‘প্রবাহ’ তার একটি অনন্য উদাহরণ। বিশ্ব পানি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আমরা নিরাপদ পানির সুযোগ আরও বিস্তৃত করা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো এবং সুস্থ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সরকারের পাশে থেকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি।”

এই সকল উদ্যোগ আরও বিস্তৃত পরিসরে গ্রহণ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। দেশের প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা অপরিহার্য। পাশাপাশি, প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগগুলোকে আরও টেকসই ও কার্যকর করা সম্ভব। এর ফলে কেবল নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাবে না বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ও সহনশীল সমাজ গড়ে উঠবে। 

ইতেফাক/এসএএস