বিশ্ব আজ এক অভূতপূর্ব স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন, অপুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা-সবকিছু মিলিয়ে মানবজাতির সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা একটি জটিল দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization (WHO) বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রধান অভিভাবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার মূল লক্ষ্য হলো- 'সব মানুষের সর্বোচ্চ সম্ভব স্বাস্থ্যমান নিশ্চিত করা।'
স্বাস্থ্যকে কেবল রোগমুক্ত অবস্থাই নয়, বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সমন্বিত অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। WHO-এর প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ- ১. স্বাস্থ্যসেবার সমতা নিশ্চিত করা: WHO বিশ্বাস করে, স্বাস্থ্যসেবা কোনো পণ্য নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
২. রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় WHO বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে। যেমন-পোলিও নির্মূল, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ, এবং সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির সময় বৈশ্বিক সমন্বয়।
৩. জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা মহামারির সময় WHO দ্রুত জরুরি সহায়তা প্রদান করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পুনর্বাসনে কাজ করে।
৪. স্বাস্থ্য গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ: WHO বিশ্ব জুড়ে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারকরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে পারেন।
৫. মানসম্মত ওষুধ ও টিকার নিশ্চয়তা: সংস্থাটি ওষুধ ও টিকার মান নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যাতে মানুষ নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা পায়।
৬. স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি: জনসাধারণকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে WHO বিভিন্ন প্রচারণা চালায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্য কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি একটি বৈশ্বিক ইস্যু। এক দেশের রোগ দ্রুত অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই মানবজাতির টেকসই উন্নয়নের জন্য সুস্বাস্থ্য অপরিহার্য। কেবল WHO-এর একার পক্ষে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষ-সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই 'সবার জন্য স্বাস্থ্য' স্বপ্নটি বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ বছর ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়েছে। WHO-এর নেতৃত্বে বিশ্ব কিছু ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে। গুটিবসন্ত সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে, যা মানব ইতিহাসে এক বিরল অর্জন। পোলিও নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে।
WHO বাংলাদেশকে টিকাদানে 'High Performing Country' হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশের সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হলো-কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, এনজিও। প্রায় ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক যেখানে প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি প্রাথমিক চিকিৎসা, টিকা, মাতৃসেবা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। টেলিমেডিসিন, মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা, ই-হেলথ রেকর্ড ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে।
এসব অর্জন দেশকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে নিঃসন্দেহে কিন্তু অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। সরকারি হাসপাতালে ভিড়, বেসরকারি হাসপাতালে আকাশছোঁয়া খরচ, আর চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস আলোচনার কেন্দ্রে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা WHO বহুবার বলেছে-'Universal Health Coverage' নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এখনো সেই লক্ষ্যের অনেক দূরে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় দীর্ঘদিন ধরেই কম। এই সীমিত বিনিয়োগের ফলে হাসপাতালের অবকাঠামো দুর্বল থাকে, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা যায়, জনবলসংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়। অর্থাৎ, সমস্যা শুরুই হয় বিনিয়োগের ঘাটতি থেকে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর ৪ শতাংশ মানুষ সংখ্যায় ৫০-৬০ লাখ শুধু চিকিৎসা-ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। একটি গুরুতর রোগ মানেই সঞ্চয় শেষ, সম্পদ বিক্রি, ঋণের বোঝা।
স্বাস্থ্যসেবা এখানে জীবন রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমা চালু ও সম্প্রসারণ একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। স্বাস্থ্যবিমা চালুর মাধ্যমে আর্থিক ঝুঁকি থেকে রোগীকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন যে চিত্র দেখা যায়, তা এক কথায় 'অতিভারাক্রান্ত'। চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব। WHO-এর মানদণ্ডের তুলনায় চিকিৎসক-নার্স অনেক কম।
বাংলাদেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু এর সঙ্গে বেড়েছে অতিরিক্ত পরীক্ষানিরীক্ষা, অস্বাভাবিক বিল, স্বচ্ছতার অভাব, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা এখানে অনেকাংশে 'বাণিজ্যিক সেবায়' পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে শহর-গ্রামের বৈষম্য এখনো প্রকট। উন্নত হাসপাতাল শহরকেন্দ্রিক। গ্রামে সীমিত চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। যদিও কমিউনিটি ক্লিনিক একটি ইতিবাচক উদ্যোগ, তবুও-বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, উন্নত পরীক্ষানিরীক্ষা গ্রামীণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে হলে নির্দিষ্ট সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য কমপক্ষে ৪৪.৫ জন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী (ডাক্তার, নার্স ও ধাত্রী) থাকা জরুরি। এই মানদণ্ডটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি একটি দেশের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা ও গুণমানের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলে। বর্তমানে দেশে প্রতি ১০ হাজার জনে গড়ে মাত্র ১০-১২ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। এই ঘাটতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে নার্সিং সেক্টর। একজন ডাক্তার যেখানে গড়ে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার মানুষের চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেখানে একজন নার্সকে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানের ওপর, যা Universal Health Coverage অর্জনের পথে বড় বাধা।
দুর্নীতি ও সুশাসনের সংকট স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ওষুধ সরবরাহে দুর্নীতি, কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি এই সমস্যাগুলো সেবার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশ এখন একটি 'epidemiological transition'-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি অসংক্রামক রোগজনিত। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো এই পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারেনি।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশে এই অধিকার এখনো সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত নয়। একদিকে সাফল্যের গল্প, অন্যদিকে বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস-এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশেরও কম, যা এই দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।
স্বাস্থ্য খাত এখনো রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় নিচের দিকে কম বিনিয়োগের কারণে। সরকারি সেবার মান কম বিধায় মানুষ বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা ক্রমশ সামর্থ্যনির্ভর হয়ে উঠছে। যার অর্থ আছে, সে উন্নত চিকিৎসা পায় আর যার অর্থ নেই, সে দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘ লাইনে, সীমিত সেবা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি মানবাধিকারের প্রশ্ন। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে বৈষম্যের গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি সভ্য, মানবিক রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তার নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সামনে এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
প্রশ্ন জাগে-এ কোন সমাজব্যবস্থা, যেখানে জীবন বাঁচানোর অধিকারটিও টাকার বিনিময়ে নির্ধারিত হয়? এ বৈষম্যের এক নির্মম বাস্তবতা স্বাস্থ্যসেবা কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। ধনীদের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা আর দরিদ্রদের জন্য সীমিত ও অনিশ্চিত সেবা। যখন স্বাস্থ্যসেবা উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়, লাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, মানুষের ব্যক্তিগত সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে, তখন এটি ধীরে ধীরে একটি 'পণ্য'তে পরিণত হয়।
একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হয়, মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যখন তার প্রতিটি নাগরিক সমানভাবে চিকিৎসার সুযোগ পায়। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্বাস্থ্যসেবা কি অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, নাকি এটি সামর্থ্যের ভিত্তিতে বিভক্ত থাকবে? একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে এই বৈষম্যের দেওয়াল ভাঙতেই হবে।
লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
