বর্তমান বাস্তবতায় মুদ্রানীতি ২০১৯-২০-এর নানান দিক

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৯, ২১:৩১

ড. শামসুল আলম

সরকারি অর্থের সঠিক ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতিকে গতিশীল করার লক্ষ্যেগত ৩১ জুলাই ২০১৯ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেট ২০১৯-২০২০-এর আর্থিক নীতি বাস্তবায়নের মূল নিয়ামকসমূহ অর্থাত্ জিডিপির প্রবৃদ্ধি (৮.২ শতাংশ) এবং মুদ্রাস্ফীতির (৫.৫ শতাংশ) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালনের লক্ষ্যেই প্রস্তাবিত নতুন মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হয়েছে। সাধারণত বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের ঘোষিত আর্থিক নীতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতেই এতদিন প্রতি অর্থবছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংক দুই পর্বে (জানুয়ারি-জুন ও জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করে আসছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে যে, এখন থেকে মুদ্রানীতি ঘোষণাপত্র অর্থবছরের শুরুতে সমগ্র বছরের জন্য একবার ঘোষণা করা হবে।

নতুন মুদ্রানীতি হচ্ছে সরকারের ২০১৯-২০ অর্থবছরের আর্থিক নীতি বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার। পূর্ববর্তী অর্থবছরের মতো ঘোষিত মুদ্রানীতিতেও নিয়ন্ত্রিত নিম্নমুখী মুদ্রাস্ফীতি সেই সঙ্গে উচ্চতর হারে জিডিপির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক মুদ্রানীতিভঙ্গী ও কর্মসূচি প্রদান করা হয়েছে। প্রস্তাবিত মুদ্রানীতি সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ অর্থবছরে ঘোষিত প্রথমার্ধ মুদ্রানীতি।

গত কয়েক বছরের মতো ঘোষিত মুদ্রানীতিতে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ঘোষিত প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির ও নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রাকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ক্রমাগত রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও কৃষিক্ষেত্রে সাফল্যসহ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গৃহীত মুদ্রানীতি ও কার্যক্রমের ফলে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ৮.১৩ শতাংশে এবং মুদ্রাস্ফীতি ৫.৬০ শতাংশের চেয়ে কম ৫.৪৭ শতাংশে অর্জিত হয়েছে। জানা যায় যে, আকস্মিক বন্যাজনিত ক্ষতি ও মেগা প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়নের কারণে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সৃষ্ট উঠতি মুদ্রাস্ফীতি ২০১৮-১৯-এ গৃহীত কার্যকর মুদ্রানীতির প্রভাবে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ কারণেই বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) ঘাটতির মাত্রা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জিডিপির ৩.২০ শতাংশ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১.৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। এর সঙ্গে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিট বৈদেশিক সম্পদের বৃদ্ধি একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যার কারণে দেশের মুদ্রাবাজারেও তারল্যের জোগানে বর্তমানে সংকট নেই বলে প্রতীয়মান হয়।

বছরে একবার মুদ্রানীতি ঘোষণার পক্ষে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, প্রথাগতভাবে অর্থবছরের শুরুতে সমগ্র বছরের জন্য মুদ্রানীতি কার্যক্রম প্রণয়ন করা হয় এবং মধ্যবর্তীকালে যে কোনো সময়ে নীতি সুদহার ও নগদ জমার/তারল্যের বিধিবদ্ধ হারসমূহকে প্রয়োজনসাপেক্ষে তাত্ক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করে প্রকাশ করা হয়। সুতরাং অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য আলাদাভাবে মুদ্রানীতি ঘোষণা বিশেষ কোনো তাত্পর্য বহন করে না বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে। প্রসঙ্গত কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক ঘোষিত মুদ্রানীতি দেশের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতির একটি প্রক্ষেপণ মাত্র। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রক্ষেপণ (প্রকাশ্য মূল্যায়ন) যত অল্প সময়ের জন্য হয় ততই ভালো বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কারণ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিগুলোকে সমন্বয় ও বাজার কুশীলবদের কার্যক্রমের বিন্যাস করা যায়। বিভিন্ন দেশে বছরে একাধিকবার প্রকাশ্য জিডিপি ঘোষণাও এ লক্ষ্যেই করা হয়, যাতে অর্থনীতির চলমান গতি ও ধারা সম্পর্কে হালচাল সম্যক ধারণা নেওয়া যায়। তবে মুদ্রানীতি যদি এক বছরের জন্যও করা হয়, তাহলে মাঝখানে একবার পুনঃপরীক্ষা করা প্রয়োজন প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য বাজার কুশীলবসহ সংশ্লিষ্টদের। মুদ্রানীতি একটা স্বল্পমেয়াদি নীতিনির্ধারণী হাতিয়ার, যার প্রধান কাজ বিনিয়োগকারীদের এমনকি ব্যবসায়ীদেরও মুদ্রাবাজারের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। এটি বিনিয়োগকারীদের মুদ্রাস্ফীতি এবং বিভিন্ন আর্থিক সূচক সম্পর্কে একটি পূর্বাভাস দেয়। এর মাধ্যমে আর্থিক বাজারের গুরুত্বপূর্ণ কুশীলব চলমান এবং ভবিষ্যত্ কর্মকাণ্ড বিষয়ে ধারণা পেতে পারে। এ কারণে এটি বছরে একের অধিক অন্তত দুইবার হওয়া ভালো ছিল বলে অনেক অর্থনীতিবিদদের ধারণা। বছরে একবার মুদ্রানীতি দেওয়া হলে তা ব্যাপক আলোচিত বাজেটের মধ্যেই হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। উল্লেখ্য, প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রতি দুই মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বর্তমানে বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি অব্যহত রাখার লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি সামগ্রিকভাবে ১৫.৯ শতাংশ ধরা হয়েছে। জাতীয় বাজেটে প্রক্ষেপিত সরকারি খাতের অভ্যন্তরীণ ঋণের মাত্রা এবং বেসরকারি খাতের ঋণের সাম্প্রতিক গতিধারা বিবেচনা করে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধির মাত্রা ১৫.৯ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছর শেষে অর্জিত হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ। বেসরকারি খাতে কমলেও বাড়ানো হয়েছে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য। উল্লেখ্য, সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি বেসরকারি ঋণের অংশের প্রবৃদ্ধি থেকে বড়ো হলেও বেসরকারি অংশের মোট অঙ্ক সরকারি অংশের চেয়ে পরিমাণে বেশি। যেহেতু বর্তমানে সরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদা সঞ্চয়পত্রের ব্যাপক জোগানে নিম্নমুখী, সেহেতু বেসরকারি খাতে ঋণের উচ্চতর প্রবৃদ্ধি হওয়ার সুযোগ থাকবে বলে আশা করা যায়। তবে অধিক ঋণপ্রবাহের লক্ষ্য প্রবৃদ্ধি অর্জনের সহায়ক হলেও বাজারে সৃষ্ট অধিক চাহিদার কারণে মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাছাড়া, সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি করায় তা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করতে পারে  বলে ব্যবসায়ীরা সব সময় শঙ্কা প্রকাশ করেন। এই আশঙ্কা অমূলক। কেননা, বেসরকারি খাতের জন্য নির্ধারিত ঋণপ্রবাহ নির্ধারিত লক্ষ্যের বেশ নিচে ছিল গত দুই মুদ্রানীতি সময়ে। গত অর্থবছরের বেসরকারি খাতে নিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্জনের অভিজ্ঞতার আলোকে এ খাতে ঋণের চাহিদা কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধান বা গবেষণা করা প্রয়োজন।

মুদ্রানীতিতে ব্যাংকঋণের গড় ভারিত সুদের হার ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে ৯.৯৫ শতাংশ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে ৯.৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ হ্রাসের এবং নতুন খেলাপি তৈরি না হওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাংকঋণের গড় ভারিত সুদের হার ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমানোর ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। যদিও ঋণ হারের বিস্তৃতি (Interest rate spread) অর্থাত্, ব্যাংক কর্তৃক ঋণ প্রদানের সুদের হার ও ডিপোজিটের সুদ হারের পার্থক্য কমানোর বিষয়ে মুদ্রানীতিতে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি, তথাপি এ উপকরণ দেশের সার্বিক আর্থিক ও মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক মর্মে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদগণ মত দেন। সুদ বিস্তৃতি কমিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্বাক থেকেছে মুদ্রানীতিতে, অথচ এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি অনুধাবনে গুরুত্বপূর্ণ চলক।

ঘোষিত মুদ্রানীতিতে রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদের হার যথাক্রমে ৬ ও ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কারণ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে হঠাত্ উদ্ভূত তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য গত মুদ্রনীতিতে কিছু পদক্ষেপ গৃহীত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় হ্রাস, আমানত ও ঋণ মুদ্রা হারের ব্যবধান কমিয়ে আনা, সরকারি সঞ্চয়পত্রের মুনফার হার ও ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার যৌক্তিকীকরণ, রপ্তানি ও যথাযথ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আহরণ জোরদার করা, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার শক্তিশালীকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি। এসব কারণে বেসরকারি ব্যাংকে আমানতযোগ্য সরকারি তহবিলের পরিমাণসহ রেমিট্যান্স, রপ্তানি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ অন্তঃপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শেষ প্রান্তে নগদ টাকা তারল্য স্থিতাবস্থায় ফিরে এসেছে। ফলশ্রুতিতে মুদ্রাবাজারে দৈনন্দিন হস্তক্ষেপের পরিবর্তে দুর্বলতর বেসরকারি ব্যাংকসমূহের প্রতিটিকে পৃথকভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থার বিধান নতুন মুদ্রনীতিতে রাখা হয়েছে, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলা আছে। উচ্চতর প্রবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যসীমায় নিয়ন্ত্রিত রাখার জন্যই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিআরআর (Complementary Reserve Ratio), রেপো ও রিভার্স রেপোর কম হার হওয়ার কারণে বাজারে অর্থের জোগান বৃদ্ধির মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি ঊর্ধ্বগতি হতে পারে। ইতিমধ্যে রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যস্ফীতির গতি ঊর্ধ্ব এবং ডলারের তুলনায় টাকার অবমূল্যায়ন ঘটেছে। বিগত কয়েক বছরে কতিপয় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার  কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার কারণে মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তাছাড়া, বিদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগে গতিশীলতা না থাকায়, বিদেশের পুঁজিবাজার থেকে কম সুদে ঋণ গ্রহণের সুবিধা প্রদান ইত্যাদি কারণে সম্প্রতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েছে।

ঘোষিত মুদ্রানীতির অপর একটি সংস্কারমূলক পদক্ষেপ হচ্ছে অন্যান্য মধ্যম আয়ের ও উন্নত দেশের ন্যায় নীতিনির্ধারণী সুদের হার হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার সুদের হার নিয়ন্ত্রণের ব্যাবস্থা গ্রহণ। প্রথাগতভাবে মুদ্রানীতিতে এত দিন ব্যাপক মুদ্রার জোগান হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার সুদের হার নিয়ন্ত্রিত করা হতো। নতুন মুদ্রানীতিতে প্রকৃত আর্থিক উন্নয়ন আনয়নের লক্ষ্যে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে উন্নয়ন আনয়নের লক্ষ্যে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে প্রণোদনা হিসেবে নগদ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ কারণে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমানো হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যায় যে, মূল্যস্ফীতি ৫.৫০ শতাংশে রেখে ৮.২০ শতাংশ প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত ঋণ প্রসার সংকুলানের লক্ষ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরের মুদ্রানীতি ইতিপূর্বের মতোই সতর্কভাবে সংকুলানমুখী করা হয়েছে। এর আগে ২০১৬-১৭  ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চলতি অ্যাকাউন্টে ব্যাপক ঘাটতির (প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার) কারণে ডলারের দাম ঊর্ধ্বমূখী থাকায় এবং আমদানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ব্যাংক রিজার্ভ ছিল নিম্নমুখী, যার কারণে চলতি অ্যাকাউন্ট ছিল নেতিবাচক। তবে এ পর্যন্ত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চলতি অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স স্বস্তিকর অবস্থায় আছে। 

অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে, বাংলাদেশের বাণিজ্যক ব্যাংকগুলোর মূল সমস্যা তহবিলের অভাব নয় বরং দুর্বল ব্যবস্থাপনাই ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমান ভঙ্গুরতার মূল কারণ। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এ অবস্থা থেকে সহসা উত্তরণ সম্পর্কে বরাবরের মতো কোনো দিকনির্দেশনা এবারও দেওয়া হয়নি। দেশের বর্তমান  অবসাদগ্রস্ত আর্থিক খাতকে চাঙ্গা করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারাকে মসৃণ করার লক্ষ্যে এ দিকে আরো বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বল্প মেয়াদে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের পাশাপাশি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এর পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দাভাব, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য সংঘাতজনিত অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক সংকুচিত অর্থব্যবস্থা, বিলম্বিত ব্রেক্সিট পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় অর্থবাজারে ক্রমবর্ধমান শ্রেণীকৃত ঋণের হার, কিছুটা সংকুচিত উদ্বৃত্ত তারল্য পরিস্থিতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই ঊর্ধ্বগতির ধারাকে ব্যাহত করতে পারে। অপরদিকে দেশের অভ্যন্তরে বন্যাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষয়ক্ষতির  বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

মুদ্রানীতির প্রস্তাবিত সব কার্যক্রমের সঠিক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরালো করা প্রয়োজন বলে অর্থনীতিবিদদের মত রয়েছে। এছাড়া দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে কৃষি-শিল্পায়ন, মাঝারি শিল্প এবং নারী ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চল ও করপোরেট উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণে উত্সাহিত করার লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না। এ লক্ষ্যে সিঙ্গেল ডিজিট সুদের হার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংককে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত মুদ্রানীতিতে এ সংক্রান্ত কোনো নীতি-উপকরণ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

পুরোনো কথাই বারবার বলতে হয়। বর্তমানে দেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে সুদের উচ্চ হার। অপরদিকে খেলাপি ঋণ সুদের বোঝাকে ক্রমাগত বৃদ্ধি করেই চলেছে। যে কারণে ব্যাংকগুলো সুদের হার কমাতে অনিচ্ছুক। এ পরিস্থিতি উত্তরণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা এবং নতুন খেলাপি ঋণ সৃষ্টি এড়ানোর প্রচেষ্টা জোরদারকরণসহ গুণগতমানের ঋণ বিতরণের ওপর গুরুত্ব প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ/কার্যক্রম গ্রহণ করা অতিশয় জরুরি।

n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সদস্য (সিনিয়র সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন।