পাবনার বেড়া উপজেলা পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত। প্রতি বছর এখানকার কৃষকরা ব্যাপক পরিমাণে পেঁয়াজ উৎপাদন করে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। উৎপাদন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন পেঁয়াজচাষিরা।
এ বছর বেড়া উপজেলায় হালি পেঁয়াজের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে বেশি হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে সন্তোষজনক। কৃষকরা আশাবাদী ছিলেন, ভালো ফলনের কারণে লাভবান হবেন। কিন্তু বাজারে এসে সেই আশায় পানি ঢেলে দিয়েছে কম দাম। উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বেড়া উপজেলায় এবার মোট ৪ হাজার ৯০৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৮৮ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের (মুড়িকাটা) পেঁয়াজ এবং বাকি ২ হাজার ৯২০ হেক্টর জমিতে হালি পদ্ধতির পেঁয়াজ আবাদ হবে।
সরজমিনে বেড়া পৌর এলাকার করমজা চতুরহাটে গিয়ে দেখা গেছে, হাটে সারি সারি পেঁয়াজের বস্তা নিয়ে বসে আছেন কৃষকরা। ক্রেতার অপেক্ষায় অনেক সময় কাটালেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। ভালো মানের প্রতি মন পেঁয়াজ (বাঁধাই উপযোগী) ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর অন্যান্য পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা কৃষকদের উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে অনেক কৃষক অভিযোগ করেন। তারা জানান, বাজারে যদি প্রতি মনের দাম ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা হতো, তাহলে অন্তত উৎপাদন খরচ উঠত।
বেড়া পৌর এলাকার বড়শিলা মহল্লার কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘এবার পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় আমরা সমস্যায় পড়েছি। যে দামে বিক্রি করছি, তাতে খরচই উঠছে না। ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’
আরেক জন কৃষক বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম প্রতি মন পেঁয়াজ অন্তত ১ হাজার ৫০০ টাকা দামে বিক্রি করতে পারব। কিন্তু এখন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে আমাদের বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে।’
করমজা চতুরহাটের আড়তদার মো. মুন্নাফ হোসেন বলেন, বর্তমানে হাটে পেঁয়াজের দাম অনেকটাই কম। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে। এ অবস্থায় কৃষকরা তাদের উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। অনেকেই লোকসান গুনে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সংরক্ষণসুবিধার অভাবের কারণে কৃষকেরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যদি আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকত, তাহলে কৃষকেরা পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে পরে বেশি দামে বিক্রি করতে পারতেন। কিন্তু পর্যাপ্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অত্র অঞ্চলের কৃষকরা দ্রুত পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সব মিলিয়ে বেড়ার পেঁয়াজচাষিদের বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। ভালো ফলন সত্ত্বেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তাদের মুখে হাসি নেই। বরং ঋণের বোঝা আর লোকসানের চিন্তায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এ খাতে কৃষকদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত কবীর বলেন, ‘চলতি মৌসুমে পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হয়েছে। তবে বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কিছুটা কম। কৃষকদের ক্ষতি কমাতে আমরা ইতিমধ্যেই সরকারিভাবে কিছু এয়ারফ্লো মেশিন সরবরাহ করেছি।’
