মোহন মৃত্যুশিল্প :ঝরাপাতার নৃত্যকলা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৫০

মানুষ জন্মগতভাবে জীবনতৃষ্ণ, পরিণামে মৃত্যুপরবশ। এই অতি সচেতন প্রাণী জৈবিক ধর্মে ভালোবাসে জীবনকে, আর আধ্যাত্মিক-দার্শনিক-নান্দনিক-বুদ্ধিবৃত্তিক প্রণোদনায় ভালোবাসে মৃত্যুকে। প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায়, তার মৃত্যুপ্রীতি আসলে জীবনপ্রীতিরই বিকল্প রূপক। মনে হয় এরই শৌখিন নাম দুঃখবিলাস। তবে মানবিক আচরণে মৌলিক মৃত্যুভীতিও সহজ দ্রষ্টব্য। আর মৃত্যু নিয়ে প্রীতি ও ভীতি যখন অঙ্গাঙ্গি সূত্রে গাঁথা হয় কবিতায়, তখন তা মূর্ত হয়ে ওঠে শিল্পের বিমূর্ত গোলাপে।

মৃত্যু বিষয়ে অনেক মোহন কবিতা আমরা পেয়েছি রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় অবধি অনেক বড় কবির কাছ থেকে। বাংলাদেশের কবিতায় এই মৃত্যুশিল্প প্রায় অচর্চিত (ব্যতিক্রম আবুল হাসানের পৃথক পালঙ্ক)। প্রেম, প্রকৃতি এবং নগরকূটৈষাই প্রধান ঝোঁক। ‘বৃক্ষমঙ্গল’-এর কবি নাসির আহমেদের কাছ থেকে সেদিন একটি আকস্মিক কাব্য উপহার পেলাম। নাম ঝরাপাতার নৃত্যকলা। আকস্মিক বলার কারণ, ‘মৃত্যুচেতনা’ এ কাব্যের আলম্বনবিভাব। কবি নাসির আহমেদের নশ্বর শরীরে কৃতান্তের দোসর কূট ব্যাধি অধিষ্ঠান নিয়েছিল। সে বড় অবিস্মরণীয় উদ্বেগী অভিজ্ঞতা। দুর্মর দীর্ঘমেয়াদী পীড়া দেহঘটকে যতখানি নাজুক করে, স্পর্শকাতর কবিমনকে করে ততোধিক মননপ্রবণ, নস্টালজিক ও সংবেদী। বিষাদ ও উত্কণ্ঠার দহন তাঁর কবিতাকে করে তোলে শুদ্ধসত্ত। নাসির আহমেদের ‘ঝরাপাতার নৃত্যকলা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি তেমনি দুঃখদহনের শুদ্ধশিল্প।

একদিন একটি গভীর কালো অন্ধকার এসে

কালো বিড়ালের ঢঙে তুলে নেবে তার নম্র

থাবার ভিতর এই সাদা বল

তারপর নিভে যাওয়া

সমস্ত আলোকসজ্জা, সমস্ত উত্সব।

                                                (গন্তব্য অজ্ঞাত)

এই ম্লান ছায়া প্রায় প্রতিটি কবিতার অঙ্গসঙ্গী। কী এক ‘ভয়াবহ সত্যের স্রোতে ভেসে যায় সব অবিনশ্বর! অনিবার্য তো শুধু সেই কালো রহস্যময় সত্য’।

জীবনের কালবেলায় এসে এই সত্যের মুখদর্শন। তাই কোনো প্রসাধনের কৃত্রিমতা নেই সে দর্শনে। ভাষা স্বচ্ছ। শব্দবন্ধ সুগম। ছন্দ ধীরবহ। নেপথ্য সূত্রধরের অন্তর্গত স্বভাবটি নমিত। আসন্ন বিদায়ের সন্ধিকালে জীবনপালার অলেখা চরণগুলি অদেখা দৃশ্যগুলি দীর্ঘনিঃশ্বাসে মন্থিত হয়ে ওঠে বারবার। প্রিয় স্মৃতি, প্রিয় যত প্রসঙ্গ :

               

সবচে’ দীর্ঘায়ু বলে খ্যাত কবিরও তো

পাণ্ডুলিপি অসমাপ্ত পঙিক্ততে নিমজ্জমান থাকে।

সমাপ্তি কোথাও নেই,

শুধু সমাপ্তির পিপাসায়

আমাদের সীমাবদ্ধ দিনরাত্রি ছটফট

কেন্দ্রমুখী রেখা শুধু বৃত্তেই ফুরায়।

                                (বৃত্তেই ফুরায়)

প্রিয়জনের স্মৃতিবিধুরতা নিয়ে একাধিক সুন্দর কবিতা রয়েছে এ বইয়ে। ‘কল্পিত নদীর গল্প’, ‘দীর্ঘশ্বাস প্রত্যাহার করো’, ‘প্রতিধ্বনি’, শোকসংবাদ’; প্রতিটি কবিতা ভারাতুর হয়ে উঠেছে মেদুর বাষ্পে। পড়তে পড়তে মনে হয় ব্যক্তিগত আর্তি কখন যেন চিরকালের বিশ্ববিষাদের অনুলিপিতে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ‘প্রতিধ্বনি’ কবিতায় মরমী মনের সেই চিরন্তন নিঃশব্দ সাধ :

 

আমি নেবুফুলের বিলোল গন্ধে

ছুঁয়ে যাবো তোমার নিঃশ্বাস

রোজ সন্ধ্যায় দাঁড়ালে জানালায়

দেখা হবে, কথা হবে

বিচ্ছেদের অন্ধকার

এইভাবে চিরদিন

আলোকিত হবে।                           (প্রতিধ্বনি)

অধিকন্তু যদিও, তবু আরেকটি অনুকূল উদ্ধৃতি দিলে এই রমণীয় আবহ পূর্ণতা পেতে পারে বুঝি :

নিঃসঙ্গ বাবুই বাসাহীন শূন্যে আছি চোখ বুঁজে

একটি চুম্বন তবু কার অর্ধ-উন্মীলিত চোখ খুঁজে খুঁজে

এখনো স্মৃতিতে বোনে স্বপ্নের সোনালি খড়কুটো।

একটি শালিক আজ সারাপথ জুড়ে, অথচ সেদিনও ছিল দুটো।

                                                                                (শোক সংবাদ)

মৃত্যুচিন্তা মাঝে মাঝে দার্শনিকতাক্রান্ত করে তোলে কবিকে। ‘শুধু সেই কালো রহস্যময়’, ‘ঝরা ঝাউপাতার অধ্যায়’, ‘মেঘাচ্ছন্ন সত্যের জন্য এলিজি’, ‘উদিত সূর্যও  জানে’, ‘অকথিত’ ইত্যাদি কবিতায় মৃত্যুর রহস্য নিবিড় গূঢ় ভাষারূপ পেয়েছে। বিষয়টির পরিণত প্রকাশ ঘটেছে ‘অর্থহীন দ্বান্দ্বিক রেখায়’ কবিতায়।

নাসির আহমেদের কলমটি স্বভাবত স্নিগ্ধ। উপমা-উেপ্রক্ষার হালকা মোচড়ে বাচ্যার্থের অতীত অন্যতর ব্যঞ্জনা আনেন তিনি কবিতায়। ‘প্রতীক্ষার প্রহর বিদীর্ণ করে’ নেমে আসা বৃষ্টি যেন ‘খরাদীর্ণ মাঠে পরাবাস্তবের সবুজ ঘাসের দল’-এর লতিয়ে ওঠা। জীবনের ‘দুই ভুল প্রান্তে’, ‘দুটি অবুঝ মোমবাতি জ্বলে’ আর তারই মাঝখানে ‘মৃত্যুশোক আগরবাতির মত জ্বলে’। অশান্ত স্বপ্নগুলোর অনিকেত চঞ্চলতা যেন নদীর ভিতর ফুরিয়ে যাওয়া নদীর মতোই। আবার সুযোগ পেলে ‘বুনে যাবো সেই দুঃখতন্তু দিয়ে পুরাতন শিল্পের কাজ একা একা আমি’। লালন ফকিরের আধুনিক বাউলিয়ানা প্রয়োগটিও চমত্কার :

হায়রে লালন ভাঙলি না এই ভেদ

বুকের মাঝে কে আসে-যায়?           (অকথিত)

কোনো কোনো চিত্রকল্পে মৃত্যুর ধূসর আভাস সরাসরি নাড়া দেয় মনকে :

ভেঙে দাও প্রচলের সব চিহ্ন স্বগর্বে, স্বহস্তে

সাজাও নিজের চিতা, আনো চেলাকাঠ; খোঁড়ো এই

শ্যামল মাটির বুকে বাঁশের পিঞ্জিরা, (ঝরা ঝাউপাতার অধ্যায়)

‘ঝরাপাতার নৃত্যকলা’ কাব্যে নাসির আহমেদ মুখরতার উচ্চরোল থেকে নেমে এসেছেন গভীরতর অন্তঃস্তলে। ভাষা সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত। অনায়াস লক্ষ্যভেদী। কবিসিদ্ধি একটা নিরন্তর নিরীক্ষানির্ভর সাধনার ধন। ‘ঝরাপাতার নৃত্যকলা’ সেই সাধনা পথের সফল পাথেয়।