তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য ভারতের প্রধান বিচারপতির, ক্ষোভে যুবক বানালো 'ককরোচ জনতা পার্টি'

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ১৭:৪০

একটি সাধারণ কৌতুক বা রসিকতা যে এভাবে ভারতের রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলবে, তা হয়তো ভাবেননি খোদ এর নির্মাতা অভিজিৎ দিপকে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাতারাতি জন্ম নিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। গত মাত্র ৭২ ঘণ্টায় এই ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনে শামিল হয়েছেন লাখ লাখ তরুণ, যার রেশ এখন দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও।

ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আদালতের এক উন্মুক্ত শুনানিতে ভারতের বেকার ও পেশাগত অবস্থানহীন তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন: "কিছু তরুণ আছে তেলাপোকার মতো, যাদের কোনও কর্মসংস্থান বা পেশাগত অবস্থান নেই। তারা কেউ গণমাধ্যম, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আবার কেউ তথ্য অধিকার (আরটিআই) কর্মী সেজে সবাইকে আক্রমণ করছে।"

পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি কেবল জালিয়াতি করে ডিগ্রি অর্জনকারীদের উদ্দেশ্য করেই এই মন্তব্য করেছিলেন, ভারতের সাধারণ যুবসমাজকে নয়। তবে এই ব্যাখ্যার পরও দেশটির ‘জেন জি’ বা তরুণ প্রজন্মের মধ্যকার ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি।

প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যকে ভারতের ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের ১২ বছরের শাসনকালের তীব্র বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে লড়াই করা তরুণদের ক্ষতস্থানে নুনের ছিটার মতো আঘাত করে।

এই চরম হতাশা ও ক্ষোভকে পুঁজি করে বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে জনসংযোগ বিষয়ে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা ৩০ বছর বয়সী তরুণ অভিজিৎ দিপকে গত শনিবার এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট করেন—"সব তেলাপোকা যদি এক হয়ে যায়, তাহলে কেমন হবে?"

এরপরই তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টুল চ্যাটজিপিটি ও ক্লদ-এর সহায়তা নিয়ে দ্রুত তৈরি করেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ইশতেহার ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট। নামটি মূলত ক্ষমতাসীন দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (বিজেপি)-র একটি ব্যঙ্গাত্মক রূপ।

ডিজিটাল দুনিয়ায় এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনটি এক অভাবনীয় সাড়া ফেলেছে। আন্দোলনের বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হলো: মাত্র তিন দিনে অ্যাকাউন্টটির অনুসারী সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। গুগল ফর্মের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৩ লাখের বেশি মানুষ এই দলে যোগ দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র, বিহারের প্রাক্তন সংসদ সদস্য কীর্তি আজাদ এবং সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ভারতের কেন্দ্রীয় আমলা আশিস জোশীর মতো ব্যক্তিত্বরা এই অভিনব দলে যোগ দিয়েছেন।

সাবেক আমলা আশিস জোশী আল-জাজিরাকে জানান, গত এক দশকে ভারতে যে ভয়ের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিভাজন তৈরি হয়েছে, তাতে এই তেলাপোকা জনতা পার্টি যেন এক "নির্মল বাতাসের ঝাপটা"। তিনি আরও যোগ করেন, তেলাপোকা অত্যন্ত সহনশীল পতঙ্গ, তারা যেকোনো প্রতিকূলতায় টিকে থাকতে পারে।

প্রবীণ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী প্রশান্ত ভূষণ বলেন, প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য মূলত আন্দোলনকারী তরুণদের প্রতি তাঁর মনে জমে থাকা গভীর কুসংস্কারেরই বহিঃপ্রকাশ। পুঁজিবাদীদের স্বার্থে দেশের অর্থনীতি যেভাবে সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে তরুণদের এই ক্ষোভ অত্যন্ত যৌক্তিক।

 

ইনস্টাগ্রামে এই দলটিকে "অলস, বেকার তেলাপোকাদের একটি ইউনিয়ন" হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। দলে যোগ দেওয়ার জন্য মজার ছলে ৪টি যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১. বেকার হতে হবে। ২. অলস হতে হবে। ৩. দীর্ঘ সময় অনলাইনে কাটাতে হবে। ৪. পেশাদারভাবে ক্ষোভ ঝাড়তে পারদর্শী হতে হবে।

দলটির মূলমন্ত্র: ‘‘এটি তরুণদের, তরুণদের দ্বারা, তরুণদের জন্য একটি রাজনৈতিক মঞ্চ। ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, অলস।’’ এর ইশতেহারে মোদি সরকারের করপোরেট তোষণ, ভোটার কারচুপি এবং বিচারকদের অবসরের পর সরকারি পদায়নের বিষয়গুলোকে তীব্র কটাক্ষ করা হয়েছে।

জনপ্রিয় ইউটিউবার মেঘনাদ এস-এর মতে, মানুষ যে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে বিকল্প রাজনৈতিক পথ খুঁজছে, এই আন্দোলন তারই প্রমাণ। বাস্তব রাজনীতির চেয়ে মানুষ এখন এই ব্যঙ্গাত্মক দলটিকে শ্রেয়তর মনে করছে।

আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে শিকাগো থেকে জানান, ভারতে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চুপ করে ছিল। এখন সময় এসেছে জবাবদিহিতা চাওয়ার। যা স্রেফ একটি কৌতুক হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা এখন ভারতের তরুণদের অধিকার আদায়ের এক অভিনব প্রতীকী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

ইত্তেফাক/এএম