জিলফুল মুরাদ
কাওরানবাজারের একজন ডাব বিক্রেতার কাছে ডাবের চড়া দামের কারণ জানতে চাইলে তিনি কলকতার চালতা বিক্রির এক গল্প শোনালেন। এই গল্পে তিনি বুঝিয়ে দিলেন হঠাত্ কোনো সংকটের কারণে কোনো পণ্যের অতিরিক্ত চাহিদা বেড়ে গেলে সেই জিনিসের দামের লাগাম টেনে ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তার ফলাফলও তিনি হাতে ধরে দেখালেন। ছোটো আকারের যে আধা নারিকেলটি মাসখানেক আগেও তিনি ২০ টাকা দিয়েও পাইকারি কিনতে আগ্রহী ছিলেন না, সেটি এখন তিনি ৩১ টাকা দিয়ে কিনেছেন। তার মতে, সারা দেশের ডেঙ্গুর প্রভাব এখন ডাবেও!
ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ডাবের পানি কেন প্রয়োজন? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সক ডা. ইমরান মোর্শেদ ইত্তেফাককে বলেন, এবারের ডেঙ্গুতে রোগীদের রক্ত থেকে জলীয় অংশ রক্ত নালীর বাহিরে চলে আসছে অর্থাত্ রোগীর প্লাজমা লিকেজ হচ্ছে। একজন সুস্থ মানুষের শরীরে প্রায় ৫ লিটার রক্ত থাকে। তার মধ্যে প্লাজমা হচ্ছে ৫৫%। এই ফ্লাজমা যদি রক্তনালি (ব্লাড ভেসেল) থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে রক্তের ভলিউম কমে যাবে, হাইপোভলিউমিয়া হবে। হাইপোভলিউমিয়া হলে রক্ত চাপ কমে গিয়ে হাইপোটেনশন হবে। আবার কিডনিতে হাইপোপারফিউশন হবার কারণে রেনাল ফেইলর হতে পারে, এতে করে ইউরিন আউটপুট কমে যাবে। এই সময় আমরা রোগীদের তরল খাবার বিশেষ করে ডাবের পানি পান করার পরামর্শ দেই। এতে পানি ও খনিজের চাহিদা পূরণ হতে পারে।
রাজধানীর মিরপুর এলাকার বাসিন্দা অনিক জামানের তিন বছর বয়সের ভাতিজার কয়েকদিন আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছে। তিনি রোগীর জন্য সেই সময় একাধিকবার ডাব কিনেছেন। তার মতে, গ্রীষ্মকালে কিছুটা হলেও ডাবের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু এবার ডেঙ্গুর প্রভাবে ডাবের চাহিদা বাড়ায় দামের যে প্রভাব পড়েছে তা তার জানা মতে সবেচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, ছোটো আকারে যে ডাব আগে ৩০/৩৫ টাকায় পাওয়া যেত তা এখন ৬০ টাকারও বেশি। খোদ কাওরান বাজারেই ডাবের দাম ৭০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
কাওরানবাজারে এক ডাব বিক্রেতা জানালেন, মাস খানেক আগে থেকে ডাবের দাম ও বিক্রি দু’ই দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি ও তার ব্যবসায়িক অংশীদার মিলে এখন গড়ে প্রায় পাঁচ’শ ডাব বিক্রি করছেন। আগে যেখানে ২০০ থেকে ২২০টি ডাব বিক্রি হতো। আর ডাবের দামও বেড়েছে দ্বিগুণ। রাজধানীর ডাবের আড়তগুলোর মধ্যে কাওরানবাজার আড়ত অন্যতম। এখানে প্রায় ২০টি আড়ত আছে। কাওরানবাজার থেকে রায়েরবাজার, শ্যামপুর, কমলাপুর এলাকা থেকে বিক্রেতারা পাইকারি ডাব কিনতে আসেন। রাজধানীর বাইরে, টঙ্গী, বেড়িবাঁধ, বাইপাইলেও রয়েছে ডাবের আড়ত। কাওরান বাজারের একজন আড়তদার খোরশেদ আলম বলেন, এখন প্রতিদিন প্রায় এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার ডাব বিক্রি হচ্ছে। ডাব বিক্রির নিয়মিত স্থানের বাইরেও এখন রাজধানীর প্রায় সকল হাসপাতালের সামনে, বিভিন্ন অলি-গলিতেও ডাব বিক্রি হচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রভাবে শুধু ডাবই নয়, রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহূত অন্য সকল পণ্যেরও দাম বেড়েছে আগের তুলনায় বেশি।
