উত্তর ইসরায়েলের কৌশলগত সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কর্তৃক দফায় দফায় শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এবার সরাসরি কূটনৈতিক ময়দানে নেমেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের জবাব দিতে তেল আবিব যাতে কোনোভাবেই ইরানের মূল ভূখণ্ডে নতুন করে কোনো পাল্টা বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা না চালায়—তা নিশ্চিত করতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে টেলিফোনে কথা বলবেন তিনি। রোববার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এই কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন।
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘এক্সিওস’ কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, “আমি এখনই বিবি (বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বহুল পরিচিত ডাক নাম)-কে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে কড়া ভাষায় বলব যে ইরানে যেন কোনো প্রকার পাল্টা হামলা বা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না চালানো হয়। তারা উভয় পক্ষই ইতিমধ্যে নিজেদের মতো করে মজা নিয়েছে—ইসরায়েল অতীতে নিজের মতো করে ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং ইরানও আজ রাতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ঠিক তা-ই করেছে। সুতরাং এই অঞ্চলে আমাদের আর নতুন কোনো যুদ্ধের বা রক্তক্ষয়ী হামলার প্রয়োজন নেই।”
সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সুদীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাস টেনে ইসরায়েলকে সংযত হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি আরও বলেন, “আজ রাতে ইসরায়েলের ওপর চালানো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌভাগ্যবশত কোনো নাগরিক গুরুতর আঘাত পায়নি বা মারা যায়নি। তাই আমি দৃঢ়ভাবে আশা করছি, ইসরায়েল এই ঘটনার পর আর কোনো হঠকারী প্রতিশোধের পথ বেছে নেবে না। তবে যদি বিবি (নেতানিয়াহু) আমার পরামর্শ অমান্য করে ইরানের বিরুদ্ধে আবারো পাল্টা সামরিক হামলা চালান, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সহিংসতা গত ৪৭ বছর বা ইসলামের সুদীর্ঘ ৩,০০০ বছরের ইতিহাসের মতোই অনন্তকাল ধরে চলতেই থাকবে, যা কেউ কখনো থামাতে পারবে না।”
উল্লেখ্য, রোববার স্থানীয় সময় মধ্যরাতে উত্তর ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে অন্তত ১০টি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। ইরানের অভিজাত সামরিক শাখা আইআরজিসির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়, শনিবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চালানো বর্বরোচিত বিমান অভিযানের দাঁতভাঙা জবাব দিতেই এই বিশেষ মিসাইল হামলা চালানো হয়েছে। গত শনিবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলিতে আইডিএফের সেই আকস্মিক বিমান হামলায় ৪ জন নিষ্পাপ শিশুসহ কমপক্ষে ২০ জন সাধারণ লেবানিজ নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছিলেন, যা ট্রাম্পকেও ক্ষুব্ধ করেছিল।
ইসরায়েলে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা এক বার্তায় ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অন্যতম শীর্ষ উপদেষ্টা মোহসিন রেজায়ি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে লক্ষ্য করে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, “আমরা আন্তর্জাতিক মহলে বার বার অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেছি যে লেবাননে ইসরায়েল কর্তৃক আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং সাধারণ মানুষের ওপর নগ্ন আগ্রাসন ইসলামী প্রজাতন্ত্রী ইরান কখনোই সহ্য করবে না। আজ রাতে আমরা কেবল সেই আগ্রাসনকারীদের একটি উপযুক্ত ও আইনি জবাব দিলাম।”
তিনি আরও যোগ করেন, “তবে আমাদের এই নিখুঁত অপারেশনটি ছিল শুধুমাত্র একটি প্রাথমিক সতর্কবার্তা মাত্র। ইসরায়েলি ও মার্কিন অশুভ শক্তি যদি এই সতর্কবার্তা আমলে না নেয়, তবে ইরানের পরবর্তী আঘাত হবে আরও বহুগুণ ব্যাপক এবং এজন্য আগ্রাসনকারীদের ইতিহাসে সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হবে।”
অন্যদিকে ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তাৎক্ষণিক এক উগ্র ও চরমপন্থী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি রাজনীতিবিদ এবং দেশটির বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন গিভর। তিনি নিজের অফিশিয়াল এক্সবার্তায় সম্পূর্ণ যুদ্ধংদেহী ভাষায় সরাসরি হুমকি দিয়ে লিখেছেন, “ইরানের এই ধৃষ্টতার কারণে এবার সরাসরি তেহরানকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেওয়া হবে।” দুই দেশের এমন অনড় অবস্থান ও পাল্টাপাল্টি হুমকির মুখে ট্রাম্পের এই জরুরি ফোন কল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে শেষ ভরসা হিসেবে কাজ করছে।

